ফাঙ্গাল পলিপ (Fungal Polyps) হলো নাকের এক ধরনের পলিপ যা নাকের ভেতরে বা সাইনাসে ছত্রাক (Fungus) সংক্রমণের কারণে তৈরি হয়। অন্যান্য পলিপের (যেমন ইথময়েডাল বা এন্ট্রোকোয়ানাল পলিপ) মতো এটিও নাকের ভেতরের নরম টিস্যুর অস্বাভাবিক বৃদ্ধি। ফাঙ্গাল পলিপ সাধারণত ক্রনিক সাইনোসাইটিসের সাথে যুক্ত থাকে এবং এটি এক বা উভয় দিকেই হতে পারে।
ফাঙ্গাল পলিপের প্রধান কারণ হলো নাকের সাইনাসে ছত্রাকের উপস্থিতি এবং এর প্রতি
শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থার প্রতিক্রিয়া। সাধারণত, পরিবেশে অসংখ্য ছত্রাকের স্পোর (বীজাণু) থাকে যা আমরা প্রতিনিয়ত
শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে গ্রহণ করি। বেশিরভাগ মানুষের শরীর এই স্পোরগুলোকে স্বাভাবিকভাবে পরিষ্কার করে দেয় বা এর
প্রতি কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায় না। তবে কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে, ছত্রাক নাকের সাইনাসে বসতি স্থাপন করে এবং প্রদাহ
সৃষ্টি করে, যার ফলে পলিপ তৈরি হয়।
এর পেছনের কারণগুলো হলো:
এটি সবচেয়ে সাধারণ কারণ। কিছু মানুষের শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা ছত্রাকের স্পোরকে ক্ষতিকারক হিসাবে দেখে এবং এর বিরুদ্ধে অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখায়। এই অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়ার ফলে নাকের টিস্যুতে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ হয় এবং ফলস্বরূপ পলিপ তৈরি হয়। একে অ্যালার্জিক ফাঙ্গাল সাইনোসাইটিস (Allergic Fungal Sinusitis - AFS) বলা হয়।
কখনও কখনও ছত্রাক নাকের সাইনাসের ভেতরে এক ধরনের বলের মতো জমাট বেঁধে যায়, যা মাইসিটোমা নামে পরিচিত। এই ছত্রাক বলগুলো শ্লেষ্মা, মৃত কোষ এবং ছত্রাকের হাইফি (সূক্ষ্ম সুতার মতো অংশ) দিয়ে গঠিত হয়। এর ফলে সাইনাসে প্রদাহ ও পলিপ হতে পারে।
এটি একটি বিরল এবং গুরুতর অবস্থা যেখানে ছত্রাক শুধু সাইনাসের ভেতরেই থাকে না, বরং সাইনাসের হাড় বা আশেপাশের টিস্যুতেও আক্রমণ করে। এটি সাধারণত দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের (যেমন ডায়াবেটিস রোগী, এইডস রোগী বা কেমোথেরাপি গ্রহণকারী) মধ্যে দেখা যায়। এই ক্ষেত্রেও পলিপ দেখা যেতে পারে, তবে এটি আরও মারাত্মক লক্ষণ সৃষ্টি করে।
যেকোনো ধরনের দীর্ঘস্থায়ী সাইনাসের প্রদাহ, তা ব্যাকটেরিয়াল বা অ্যালার্জিকই হোক, ফাঙ্গাল সংক্রমণের জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারে।
ফাঙ্গাল পলিপের লক্ষণগুলো অন্যান্য সাইনাস বা নাকের পলিপের মতোই হতে পারে, তবে কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে:
(১) নাক বন্ধ থাকা: পলিপের কারণে এক বা উভয় নাক বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
(২) নাক দিয়ে ঘন শ্লেষ্মা বা পুঁজের মতো পদার্থ পড়া: কখনও কখনও এই শ্লেষ্মা গাঢ় এবং কালো বা বাদামী রঙের হতে পারে, যা ছত্রাকের উপস্থিতির ইঙ্গিত দেয়।
(৩) নাকে চাপ বা ব্যথা: সাইনাসে চাপ বা ব্যথা অনুভূত হতে পারে, যা মুখ, কপাল বা চোখের চারপাশে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
(৪) গন্ধ কমে যাওয়া বা না থাকা (Hyposmia/Anosmia): ঘ্রাণশক্তি প্রভাবিত হতে পারে।
(৫) পোস্টন্যাসাল ড্রিপ (Postnasal Drip): শ্লেষ্মা গলার পেছনের দিকে নেমে আসে, যা কাশি বা গলা পরিষ্কার করার প্রবণতা বাড়ায়।
(৬) মাথাব্যথা: ক্রনিক সাইনোসাইটিসের সাথে যুক্ত মাথাব্যথা।
(৭) চোখের সমস্যা (বিরল ক্ষেত্রে): যদি ছত্রাক সাইনাস থেকে চোখ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে চোখে ব্যথা, ফোলা বা দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়ার
মতো গুরুতর সমস্যা হতে পারে। (এটি ইনভেসিভ ফর্মের ক্ষেত্রে বেশি দেখা যায়।)
ফাঙ্গাল পলিপ নির্ণয়ের জন্য একজন নাক, কান, গলা বিশেষজ্ঞ (ENT Specialist) সাধারণত নিম্নলিখিত পরীক্ষাগুলো করে থাকেন:
(১) নাকের এন্ডোস্কোপি: নাকের ভেতরে একটি ছোট ক্যামেরা প্রবেশ করিয়ে পলিপ এবং সাইনাসের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হয়।
(২) সিটি স্ক্যান (CT Scan): এটি সাইনাসের ভেতরের কাঠামো এবং পলিপের অবস্থান, আকার ও বিস্তারের বিস্তারিত চিত্র দেয়।
ফাঙ্গাল পলিপের ক্ষেত্রে সিটি স্ক্যানে কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য দেখা যেতে পারে, যেমন সাইনাসের ভেতরে ঘন উপাদান (hyperdense material)।
(৩) বায়োপসি এবং হিস্টোপ্যাথলজি: পলিপের একটি ছোট অংশ নিয়ে ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা হয় ছত্রাকের উপস্থিতি নিশ্চিত
করার জন্য এবং পলিপের ধরন (যেমন অ্যালার্জিক ফাঙ্গাল সাইনোসাইটিস বা ইনভেসিভ ফর্ম) নির্ধারণের জন্য।
(৪) কালচার: কিছু ক্ষেত্রে, শ্লেষ্মার নমুনা বা পলিপের অংশ থেকে ছত্রাক কালচার করে সুনির্দিষ্ট ছত্রাক শনাক্ত করা হয়।
ফাঙ্গাল পলিপের চিকিৎসা নির্ভর করে এর ধরন এবং তীব্রতার ওপর।
১. অস্ত্রোপচার (Surgery):
বেশিরভাগ ফাঙ্গাল পলিপের ক্ষেত্রে ফাংশনাল এন্ডোস্কোপিক সাইনাস সার্জারি (FESS) হলো প্রধান চিকিৎসা। এই পদ্ধতিতে নাকের ভেতর দিয়ে এন্ডোস্কোপ ব্যবহার করে পলিপ এবং সাইনাসের ভেতরে জমে থাকা ছত্রাকীয় উপাদান (যেমন ফাঙ্গাস বল) সম্পূর্ণরূপে অপসারণ করা হয়। অ্যালার্জিক ফাঙ্গাল সাইনোসাইটিসের ক্ষেত্রেও এই পদ্ধতি কার্যকর।
২. অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধ:
(ক) ওরাল অ্যান্টিফাঙ্গাল: কিছু ক্ষেত্রে, বিশেষ করে ইনভেসিভ ফাঙ্গাল সাইনোসাইটিসে, মুখে খাওয়ার
অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধ প্রয়োজন হতে পারে।
(খ) টপিক্যাল অ্যান্টিফাঙ্গাল রিন্স: অস্ত্রোপচারের পর কিছু ডাক্তার নাকের মধ্যে ব্যবহারের জন্য অ্যান্টিফাঙ্গাল মিশ্রিত সেলাইন ওয়াশ
(saline rinse) সুপারিশ করতে পারেন।
(গ) স্টেরয়েড: অ্যালার্জিক ফাঙ্গাল সাইনোসাইটিসের ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের পর প্রদাহ কমাতে এবং পুনরাবৃত্তি রোধ করতে ন্যাসাল
স্টেরয়েড স্প্রে বা স্বল্প সময়ের জন্য ওরাল স্টেরয়েড ব্যবহার করা হয়।
(ঘ) অ্যালার্জি ব্যবস্থাপনা: যদি অ্যালার্জিক ফাঙ্গাল সাইনোসাইটিস হয়, তাহলে অ্যালার্জির চিকিৎসা এবং অ্যালার্জেন (যেমন ছত্রাক)
এড়িয়ে চলার চেষ্টা করা গুরুত্বপূর্ণ। ফাঙ্গাল পলিপের চিকিৎসা জটিল হতে পারে এবং এর পুনরাবৃত্তি রোধে অস্ত্রোপচারের পরও দীর্ঘমেয়াদী ফলোআপ ও যত্নের
প্রয়োজন হতে পারে। যদি ফাঙ্গাল পলিপের কোনো লক্ষণ থাকে, তবে দ্রুত একজন নাক, কান, গলা বিশেষজ্ঞের সাথে পরামর্শ করা উচিত।