নিওপ্লাস্টিক পলিপ (Neoplastic Polyps) হলো নাকের ভেতরের বা সাইনাসের এমন ধরনের বৃদ্ধি যা টিউমার বা ক্যান্সারের কারণে সৃষ্ট হয়। অন্যান্য নাকের পলিপ (যেমন ইথময়েডাল বা এন্ট্রোকোয়ানাল পলিপ) সাধারণত নিরীহ বা নন-ক্যান্সারজনিত হয়ে থাকে, কিন্তু নিওপ্লাস্টিক পলিপের ক্ষেত্রে কোষের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটে যা ম্যালিগন্যান্ট (ক্যান্সারযুক্ত) বা বিনাইন (ক্যান্সারবিহীন কিন্তু টিউমার) হতে পারে। এটি নাকের পলিপের অন্যান্য ধরনের তুলনায় অত্যন্ত বিরল।
"নিওপ্লাস্টিক" শব্দটি "নিওপ্লাসিয়া" (Neoplasia) থেকে এসেছে, যার অর্থ হলো কোষের নতুন এবং অস্বাভাবিক বৃদ্ধি। যখন এই অস্বাভাবিক কোষগুলো নাকের বা সাইনাসের শ্লেষ্মা ঝিল্লিতে বা তার আশেপাশের টিস্যুতে জমা হয়ে একটি পিণ্ড বা পলিপের মতো গঠন তৈরি করে, তখন তাকে নিওপ্লাস্টিক পলিপ বলা হয়। এই বৃদ্ধিগুলো হতে পারে:
(১) বিনাইন (Benign) টিউমার:এগুলো ক্যান্সারবিহীন টিউমার যা শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে না, তবে আকারে বড় হতে পারে এবং স্থানীয়ভাবে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। নাকের ক্ষেত্রে, ইনভার্টেড প্যাপিওলোমা (Inverted Papilloma) একটি সাধারণ বিনাইন নিওপ্লাস্টিক পলিপ যা পুনরাবৃত্তি প্রবণ এবং কিছু ক্ষেত্রে ক্যান্সারে রূপান্তরিত হতে পারে।
(২) ম্যালিগন্যান্ট (Malignant) টিউমার/ক্যান্সার: এগুলো ক্যান্সারযুক্ত টিউমার যা দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে, আশেপাশের টিস্যুতে আক্রমণ করতে পারে এবং শরীরের অন্য অংশে (মেটাস্ট্যাসিস) ছড়িয়ে পড়তে পারে। নাকের বা সাইনাসের ক্যান্সারের মধ্যে স্কোয়ামাস সেল কার্সিনোমা (Squamous Cell Carcinoma), অ্যাডেনোকার্সিনোমা (Adenocarcinoma) বা মেলানোমা (Melanoma) অন্যতম।
নিওপ্লাস্টিক পলিপের সুনির্দিষ্ট কারণ সবসময় জানা যায় না, তবে কিছু কারণ এবং ঝুঁকির কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে:
(১) জেনেটিক পরিবর্তন: কোষের ডিএনএ-তে অস্বাভাবিক পরিবর্তন বা মিউটেশন নিওপ্লাসিয়ার মূল কারণ।
(২) পরিবেশগত কারণ: কিছু রাসায়নিক পদার্থ বা ধুলোর সংস্পর্শে আসা, যেমন কাঠ বা চামড়ার ধুলো,
নিকেল, ক্রোমিয়াম, বা অ্যালকোহল ও তামাকের ব্যবহার নাকের ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
(৩) ভাইরাল সংক্রমণ: হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস (HPV) নাকের ইনভার্টেড প্যাপিওলোমা সৃষ্টির সাথে যুক্ত, যা কিছু ক্ষেত্রে ক্যান্সারে রূপান্তরিত হতে পারে।
(৪) দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ: কিছু দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহজনিত অবস্থা ক্যান্সার সৃষ্টিতে অবদান রাখতে পারে, যদিও এটি সরাসরি কারণ নয়।
(৫) দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা: দুর্বল প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্ন ব্যক্তিদের ক্যান্সারের ঝুঁকি কিছুটা বেশি হতে পারে।
নিওপ্লাস্টিক পলিপের লক্ষণগুলো অন্যান্য পলিপের মতো সাধারণ হতে পারে, তবে কিছু বিশেষ লক্ষণও
দেখা দিতে পারে যা ক্যান্সারের ইঙ্গিত দেয়:
(১) একপাশের নাক বন্ধ থাকা: এটি একটি সাধারণ লক্ষণ, যা অনেক সময় ওষুধে ভালো হয় না।
(২) নাক দিয়ে রক্ত পড়া (Epistaxis): বারবার বা অস্বাভাবিক পরিমাণে নাক দিয়ে রক্ত পড়া একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হতে পারে।
(৩) নাক দিয়ে দুর্গন্ধযুক্ত নিঃসরণ: নাকের একপাশ থেকে ঘন বা দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব বের হতে পারে।
(৪) নাক বা মুখের ব্যথা: স্থানীয়ভাবে ব্যথা বা চাপ অনুভূত হতে পারে, যা সময়ের সাথে বাড়তে পারে।
(৫) মুখ বা চোখের ফোলা: যদি টিউমার সাইনাস থেকে চোখ বা মুখে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে চোখ ফুলে যাওয়া, ডাবল ভিশন বা মুখের অসাড়তা দেখা দিতে পারে।
(৬) গন্ধ কমে যাওয়া বা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাওয়া: ঘ্রাণশক্তি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।
(৭) দাঁতে ব্যথা বা দাঁত নড়ে যাওয়া: টিউমার উপরের চোয়ালে (ম্যাক্সিলা) ছড়িয়ে পড়লে দাঁতের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
(৮) কান ব্যথা বা কম শোনা: নাকের টিউমার ইউস্টেশিয়ান টিউবে চাপ সৃষ্টি করলে কানে সমস্যা হতে পারে।
(৯) লিম্ফ নোড ফোলা: ঘাড়ের লিম্ফ নোড ফুলে যাওয়া ক্যান্সারের ছড়িয়ে পড়ার একটি লক্ষণ হতে পারে। যেহেতু এই লক্ষণগুলো সাধারণ পলিপ বা
সাইনোসাইটিসের সাথেও মিলে যায়, তাই যে কোনো অস্বাভাবিক বা দীর্ঘস্থায়ী লক্ষণের ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
নিওপ্লাস্টিক পলিপ নির্ণয়ের জন্য ব্যাপক পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন হয়:
১. নাকের এন্ডোস্কোপি:
নাকের ভেতরে একটি নমনীয় ক্যামেরা প্রবেশ করিয়ে পলিপ এবং আশেপাশের টিস্যুর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হয়।
২. ইমেজিং স্টাডিজ:
(ক) সিটি স্ক্যান (CT Scan): এটি সাইনাস এবং হাড়ের কাঠামোগত পরিবর্তন দেখতে সাহায্য করে।
(খ) এমআরআই (MRI): এটি নরম টিস্যু, টিউমারের বিস্তার এবং আশেপাশের স্নায়ু বা মস্তিষ্কে কোনো প্রভাব আছে কিনা তা দেখতে বেশি কার্যকর।
(গ) বায়োপসি (Biopsy): এটি নিওপ্লাস্টিক পলিপ নির্ণয়ের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। পলিপের একটি ছোট অংশ অপসারণ করে মাইক্রোস্কোপের নিচে
পরীক্ষা করা হয় কোষের অস্বাভাবিকতা এবং ক্যান্সার আছে কিনা তা নিশ্চিত করার জন্য। বায়োপসি ছাড়া নিওপ্লাস্টিক পলিপ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
নিওপ্লাস্টিক পলিপের চিকিৎসা তার ধরন (বিনাইন না ম্যালিগন্যান্ট) এবং বিস্তারের ওপর নির্ভর করে:
১. অস্ত্রোপচার (Surgery): বেশিরভাগ নিওপ্লাস্টিক পলিপের ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারই প্রধান চিকিৎসা।
(ক) বিনাইন টিউমার: ইনভার্টেড প্যাপিওলোমার মতো বিনাইন টিউমারগুলো এন্ডোস্কোপিক সার্জারির মাধ্যমে অপসারণ করা হয়।
যেহেতু এটি পুনরাবৃত্ত হতে পারে এবং ক্যান্সারে রূপান্তরিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে, তাই সম্পূর্ণ অপসারণ এবং নিয়মিত ফলোআপ জরুরি।
(খ) ম্যালিগন্যান্ট টিউমার (ক্যান্সার): ক্যান্সারের ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে টিউমারটি সম্পূর্ণভাবে অপসারণ
করা হয়। এটি এন্ডোস্কোপিক্যালি বা ওপেন সার্জারির মাধ্যমে হতে পারে, টিউমারের আকার এবং অবস্থানের ওপর নির্ভর করে।
২. রেডিয়েশন থেরাপি (Radiation Therapy): ক্যান্সারের কোষগুলোকে ধ্বংস করার জন্য উচ্চ-শক্তির বিকিরণ
ব্যবহার করা হয়। এটি অস্ত্রোপচারের আগে বা পরে, অথবা অস্ত্রোপচার সম্ভব না হলে একক চিকিৎসা হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
৩. কেমোথেরাপি (Chemotherapy): ক্যান্সার কোষকে মেরে ফেলার জন্য ওষুধ ব্যবহার করা হয়। এটি সাধারণত
অ্যাডভান্সড ক্যান্সারের ক্ষেত্রে অথবা যখন ক্যান্সার শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে তখন ব্যবহার করা হয়।
৪. লক্ষ্যবস্তু থেরাপি (Targeted Therapy) ও ইমিউনোথেরাপি (Immunotherapy): কিছু নির্দিষ্ট ধরণের ক্যান্সারের
জন্য নতুন এই থেরাপিগুলো ব্যবহার করা হয় যা ক্যান্সার কোষের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যগুলোকে লক্ষ্য করে আক্রমণ করে বা শরীরের নিজস্ব রোগ
প্রতিরোধ ক্ষমতাকে ক্যান্সার মোকাবিলায় সাহায্য করে। নিওপ্লাস্টিক পলিপের ক্ষেত্রে দ্রুত রোগ নির্ণয় এবং উপযুক্ত চিকিৎসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে সফল চিকিৎসার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে। তাই, নাকের অস্বাভাবিক বা দীর্ঘস্থায়ী কোনো লক্ষণ দেখা দিলে
অবিলম্বে একজন নাক, কান, গলা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া অত্যাবশ্যক।