এন্ট্রোকোয়ানাল পলিপ (Antrochoanal Polyp) হলো নাকের এক ধরনের বিশেষ পলিপ, যা নাকের
পাশে গালের হাড়ের ভেতরের বায়ুভর্তি গহ্বর ম্যাক্সিলারি সাইনাস (Maxillary Sinus) থেকে উৎপন্ন হয়। এটি সাধারণত নাকের
একদিকেই দেখা যায় এবং শিশুদের মধ্যে তুলনামূলকভাবে বেশি প্রচলিত।
এন্ট্রোকোয়ানাল পলিপের বিস্তারিত বর্ণনা:
এন্ট্রোকোয়ানাল পলিপ তার নামের মধ্যেই এর উৎপত্তি এবং বিস্তারকে বহন করে। "অ্যান্ট্রো" (Antro-) শব্দটি ম্যাক্সিলারি সাইনাসের একটি অংশ থেকে আসে, যা "অ্যান্ট্রাম" (Antrum) নামে পরিচিত। "কোয়ানাল" (Choanal) শব্দটি নাকের পেছনের অংশকে বোঝায়, যা নাকের গহ্বরকে গলার সাথে সংযুক্ত করে। এই পলিপটি ম্যাক্সিলারি সাইনাসের ভেতর থেকে উৎপন্ন হয়ে নাকের পেছনের দিকে (কোয়ানা) বিস্তৃত হয় এবং কখনও কখনও গলার পেছনের অংশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এটি দেখতে সাধারণত মসৃণ, ধূসর বা ফ্যাকাশে সাদা রঙের হয়।
এন্ট্রোকোয়ানাল পলিপের সঠিক কারণ এখনও সম্পূর্ণভাবে জানা যায়নি, তবে এটি সাধারণত দীর্ঘস্থায়ী
প্রদাহ বা সংক্রমণের সাথে যুক্ত। কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ এবং ঝুঁকি উপাদান নিচে দেওয়া হলো:
(১) দীর্ঘস্থায়ী সাইনোসাইটিস (Chronic Sinusitis): ম্যাক্সিলারি সাইনাসে দীর্ঘমেয়াদী প্রদাহ বা সংক্রমণ এই
ধরনের পলিপ সৃষ্টির একটি প্রধান কারণ। এটি সাধারণত ব্যাকটেরিয়াল বা ফাঙ্গাল ইনফেকশনের কারণে হতে পারে।
(২) অ্যালার্জি: অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া নাকের মিউকাস মেমব্রেনে প্রদাহ সৃষ্টি করে, যা পলিপ তৈরির ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
(৩) রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম: যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল, তাদের বারবার সংক্রমণ হওয়ার প্রবণতা বেশি থাকে, যা পলিপ সৃষ্টিতে সহায়ক হতে পারে।
(৪) শারীরিক অস্বাভাবিকতা: কিছু ক্ষেত্রে নাকের ভেতরের কাঠামোগত অস্বাভাবিকতা, যেমন ডেভিয়েটেড সেপ্টাম (বাঁকা নাক), সাইনাস ড্রেনেজে বাধা সৃষ্টি করে যা সংক্রমণ ও পলিপের কারণ হতে পারে।
(৫) শিশুদের ক্ষেত্রে বেশি: যদিও এটি যেকোনো বয়সে হতে পারে, তবে ইথময়েডাল পলিপের তুলনায় শিশুদের মধ্যে এন্ট্রোকোয়ানাল পলিপ বেশি দেখা যায়।
এন্ট্রোকোয়ানাল পলিপের লক্ষণগুলো নির্ভর করে এর আকার এবং বিস্তারের ওপর। যেহেতু এটি সাধারণত এক দিকে হয়, লক্ষণগুলোও একপাশে বেশি প্রকট হয়:
(১) একপাশের নাক বন্ধ থাকা: এটি সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ। পলিপটি বড় হলে সম্পূর্ণভাবে একপাশের নাক বন্ধ করে দিতে পারে।
(২) নাক দিয়ে শ্লেষ্মা বা পুঁজের মতো পদার্থ পড়া (Postnasal Drip): পলিপের কারণে সাইনাস থেকে শ্লেষ্মা বা সংক্রমণের কারণে পুঁজের মতো পদার্থ গলার পেছনের দিকে নেমে আসে।
(৩) নাক ডাকা ও ঘুমের সমস্যা: নাক বন্ধ থাকার কারণে ঘুমের সময় নাক ডাকা বা শ্বাস নিতে কষ্ট হতে পারে।
(৪) গলায় অস্বস্তি বা গলা ব্যথা: পলিপ গলায় পৌঁছে গেলে গলায় অস্বস্তি, কাশি বা বারবার গলা পরিষ্কার করার প্রবণতা দেখা দিতে পারে।
(৫) গন্ধ না পাওয়া বা কমে যাওয়া (Hyposmia/Anosmia): নাকের পথ বন্ধ থাকার কারণে গন্ধ পাওয়ার ক্ষমতা কমে যেতে পারে বা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
(৬) মাথাব্যথা: সাইনাসে চাপ পড়ার কারণে কপাল বা গালে ব্যথা হতে পারে।
(৭) কানে সমস্যা: কিছু ক্ষেত্রে ইউস্টেশিয়ান টিউবের কার্যকারিতা ব্যাহত হওয়ার কারণে কানে অস্বস্তি, ব্যথা বা কম শোনা যেতে পারে।
(৮) কথা বলার সময় নাকিস্বর: নাক বন্ধ থাকার কারণে কণ্ঠস্বরে পরিবর্তন আসতে পারে। এন্ট্রোকোয়ানাল পলিপের চিকিৎসা
এন্ট্রোকোয়ানাল পলিপের চিকিৎসা সাধারণত অস্ত্রোপচারের মাধ্যমেই হয়ে থাকে, কারণ এটি ওষুধে পুরোপুরি সারে না এবং বারবার ফিরে আসার প্রবণতা থাকে।
(ক) ফাংশনাল এন্ডোস্কোপিক সাইনাস সার্জারি (FESS): এটি সবচেয়ে প্রচলিত এবং কার্যকর পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে
নাকের ভেতর দিয়ে একটি এন্ডোস্কোপ প্রবেশ করানো হয় এবং ম্যাক্সিলারি সাইনাস থেকে পলিপের মূল অংশসহ পুরো পলিপটি অপসারণ করা হয়। এই পদ্ধতিটি ন্যূনতম
আক্রমণাত্মক এবং দ্রুত সুস্থ হওয়া যায়।
(খ) বিশেষ করে যেহেতু এন্ট্রোকোয়ানাল পলিপের মূল ম্যাক্সিলারি সাইনাসের ভেতরে থাকে, তাই পলিপের পুনরাবৃত্তি রোধ করতে মূল উৎপত্তিস্থল থেকে এটি
সম্পূর্ণভাবে অপসারণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
(ক) অস্ত্রোপচারের পর কিছুদিনের জন্য অ্যান্টিবায়োটিক এবং ন্যাসাল স্টেরয়েড স্প্রে ব্যবহার করা হতে পারে যাতে সংক্রমণ না হয়
এবং নাকের ভেতরের টিস্যুর প্রদাহ কমে।
(খ) লবণ পানি দিয়ে নিয়মিত নাক পরিষ্কার করলে নাককে সুস্থ রাখতে এবং দ্রুত আরোগ্য লাভে সাহায্য করে। এন্ট্রোকোয়ানাল পলিপ নির্ণয় করা হয় সাধারণত নাক,
কান, গলা বিশেষজ্ঞের (ENT Specialist) দ্বারা একটি সম্পূর্ণ শারীরিক পরীক্ষার মাধ্যমে, যেখানে নাকের এন্ডোস্কোপি এবং প্রয়োজনে সিটি স্ক্যান (CT Scan) করা হয়।
সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা না হলে এটি শ্বাস-প্রশ্বাসে গুরুতর বাধা সৃষ্টি করতে পারে এবং জীবনযাত্রার মানকে প্রভাবিত করতে পারে।