ইথময়েডাল পলিপ হলো নাকের এক ধরনের পলিপ (Nasal Polyps) যা নাকের ভেতরের ইথময়েডাল
সাইনাস নামক বায়ুভর্তি কুঠুরি থেকে উৎপন্ন হয়। এটি নাকের পলিপের দুটি প্রধান প্রকারের মধ্যে একটি। ইথময়েডাল পলিপ সাধারণত
নাকের উভয় পাশেই দেখা যায় এবং বয়স্ক রোগীদের মধ্যে বেশি প্রচলিত।
ইথময়েডাল পলিপের বিস্তারিত বর্ণনা করা হলো:
নাকের ভেতরে বা সাইনাসের আবরণী ঝিল্লি (মিউকাস মেমব্রেন) দীর্ঘমেয়াদী প্রদাহ বা অ্যালার্জির কারণে ফুলে ওঠে এবং আঙুরের থোকার মতো নরম, ব্যথাহীন মাংসপিণ্ড তৈরি করে, যা ইথময়েডাল পলিপ নামে পরিচিত। এটি দেখতে অনেকটা ফ্যাকাশে বা ধূসর রঙের হয় এবং নাকের ভেতরে উপর থেকে ঝুলে থাকে।
ইথময়েডাল পলিপের সঠিক কারণ পুরোপুরি জানা যায়নি, তবে কিছু বিষয় এর উৎপত্তিতে
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে:
১. দীর্ঘমেয়াদী প্রদাহ বা অ্যালার্জি: এটি সবচেয়ে সাধারণ কারণ। নাকের ভেতরের
ঝিল্লিতে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ বা অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া দেখা দিলে টিস্যু ফুলে যায় এবং পলিপ তৈরি হয়।
২. হাঁপানি (Asthma): যাদের হাঁপানি আছে, তাদের ইথময়েডাল পলিপ হওয়ার প্রবণতা বেশি।
৩. সিস্টিক ফাইব্রোসিস (Cystic Fibrosis): এটি একটি জেনেটিক রোগ যা বিভিন্ন গ্রন্থিকে প্রভাবিত করে এবং এর ফলে নাকের পলিপ হতে পারে।
৪. ননস্টেরয়েডাল অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ড্রাগস (NSAIDs) প্রতি সংবেদনশীলতা: কিছু রোগীর নির্দিষ্ট NSAIDs যেমন অ্যাসপিরিনের প্রতি সংবেদনশীলতা থাকে, যা পলিপের কারণ হতে পারে।
৫. বারবার সংক্রমণ: নাকের বারবার সংক্রমণ বা ক্রনিক সাইনোসাইটিসও পলিপ তৈরির কারণ হতে পারে।
৬. ছত্রাক সংক্রমণ (Fungal Infection): কিছু ক্ষেত্রে নাকের ছত্রাক সংক্রমণও ইথময়েডাল পলিপ তৈরি করতে পারে।
৭. পারিবারিক ইতিহাস: পরিবারে নাকের পলিপের ইতিহাস থাকলে তা হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
ইথময়েডাল পলিপ সাধারণত ধীরে ধীরে বড় হয় এবং এর আকার বাড়ার সাথে সাথে লক্ষণগুলো তীব্র হয়। এর প্রধান লক্ষণগুলো হলো:
১. নাক বন্ধ থাকা: নাকের দুই পাশই আংশিক বা সম্পূর্ণ বন্ধ থাকতে পারে, যার ফলে শ্বাস নিতে অসুবিধা হয়।
২. নাক দিয়ে পানি ঝরা: নাকের ঝিল্লি থেকে অতিরিক্ত শ্লেষ্মা নিঃসৃত হয়।
৩. নাকে গন্ধ না পাওয়া (Anosmia): পলিপের কারণে ঘ্রাণতন্ত্রের কার্যকারিতা ব্যাহত হতে পারে।
৪. মাথাব্যথা: সাইনাসে চাপ পড়ার কারণে মাথাব্যথা হতে পারে।
৫. নাক ডাকা ও ঘুমের সমস্যা: নাক বন্ধ থাকার কারণে ঘুমের সময় নাক ডাকা বা স্লিপ অ্যাপনিয়া হতে পারে।
৬. কান ব্যথা ও কানে কম শোনা: নাকের সমস্যার কারণে ইউস্টেশিয়ান টিউবে প্রভাব পড়তে পারে, ফলে কানে ব্যথা বা কম শোনা যেতে পারে।
৭. মুখ ও কপালে চাপ বা ব্যথা: সাইনাসের প্রদাহের কারণে মুখমণ্ডল ও কপালে চাপের অনুভূতি বা ব্যথা হতে পারে।
৮. নাকিস্বরে কথা বলা: নাক বন্ধ থাকার কারণে গলার স্বর পরিবর্তিত হয়ে নাকিস্বরে কথা তৈরি হতে পারে।
ইথময়েডাল পলিপের চিকিৎসা সাধারণত দুটি উপায়ে করা হয়:
(ক) ন্যাসাল স্টেরয়েড স্প্রে: ছোট পলিপের ক্ষেত্রে নাকের ভেতরের প্রদাহ কমাতে স্টেরয়েড
স্প্রে ব্যবহার করা হয়। এটি পলিপকে ছোট করতে সাহায্য করে।
(খ) ওরাল স্টেরয়েড: কিছু ক্ষেত্রে স্বল্প সময়ের জন্য মুখে খাওয়ার স্টেরয়েড দেওয়া হতে পারে, যা পলিপের আকার দ্রুত কমাতে সাহায্য করে।
(গ) অ্যালার্জি ব্যবস্থাপনা: অ্যালার্জির কারণ শনাক্ত করে তা এড়িয়ে চলা এবং অ্যান্টিহিস্টামিন বা অন্যান্য অ্যালার্জির ওষুধ ব্যবহার করা।
(ঘ) নাক পরিষ্কার রাখা: লবণ পানি দিয়ে নাক পরিষ্কার করলে আরাম পাওয়া যায় এবং শ্লেষ্মা পরিষ্কার হয়।
২. অস্ত্রোপচার (Surgery):
(ক) যদি ওষুধে পলিপ না কমে বা আকার অনেক বড় হয়ে যায়, তখন অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয়। বর্তমানে ফাংশনাল এন্ডোস্কোপিক সাইনাস সার্জারি
(FESS) একটি সাধারণ পদ্ধতি, যেখানে নাকের ভেতর দিয়ে এন্ডোস্কোপ ব্যবহার করে পলিপ অপসারণ করা হয়। এই পদ্ধতিতে কম কাটাছেঁড়া হয় এবং দ্রুত সুস্থ হওয়া যায়।
(খ) অস্ত্রোপচারের পর কিছু ক্ষেত্রে পলিপ আবার ফিরে আসতে পারে, তাই নিয়মিত ফলোআপ এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ ব্যবহার করা জরুরি। ইথময়েডাল পলিপের সঠিক
রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসার জন্য একজন নাক, কান, গলা বিশেষজ্ঞের (ENT Specialist) পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা এন্ডোস্কোপিক পরীক্ষা এবং প্রয়োজনে
সিটি স্ক্যানের মাধ্যমে পলিপের ধরন ও ব্যাপকতা নির্ণয় করে সঠিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারেন। আপনার কি ইথময়েডাল পলিপের লক্ষণ সম্পর্কে আরও কিছু জানার আছে?