পিএলআইডি (Prolapsed Intervertebral Disc - PLID), যা সাধারণত "স্লিপড ডিস্ক" (Slipped Disc) নামে পরিচিত, মানব ইতিহাসের প্রাচীনকাল থেকেই একটি পরিচিত কিন্তু প্রায়শই ভুল বোঝা রোগ ছিল। এর ইতিহাস মানবদেহের গঠন এবং এর জটিলতা বোঝার যাত্রার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
১. অস্পষ্টতা: প্রাচীন মিশরীয়, গ্রীক বা রোমান চিকিৎসকদের লেখায় পিএলআইডি-এর
মতো সুনির্দিষ্ট সমস্যার সরাসরি উল্লেখ খুব কমই পাওয়া যায়। মেরুদণ্ডের ব্যথা, বিশেষ করে কোমর ব্যথা বা সায়াটিকা
(পা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়া ব্যথা) -এর মতো উপসর্গগুলি অবশ্য বর্ণিত ছিল। তবে, এর পেছনের প্রকৃত কারণ,
অর্থাৎ ডিস্কের সমস্যা, তখনো অজানা ছিল।
২. প্রাথমিক চিকিৎসা: সেই সময়কার চিকিৎসায় মূলত ব্যথা উপশমের জন্য ভেষজ ঔষধ,
মাসাজ, তাপ প্রয়োগ, বা কখনো কখনো ম্যানিপুলেশনের মতো পদ্ধতি ব্যবহার করা হতো। ডিস্কের গঠন বা তার ক্ষতির
ধারণার অভাবে, এসব চিকিৎসা ছিল মূলত উপসর্গ-ভিত্তিক।
১. অ্যানাটমিক্যাল আবিষ্কার: রেনেসাঁস যুগে লিওনার্দো দা ভিঞ্চি এবং আন্দ্রেয়াস
ভেসালিয়াস-এর মতো অ্যানাটমিস্টরা মানবদেহের ব্যবচ্ছেদের মাধ্যমে মেরুদণ্ডের গঠন সম্পর্কে গভীর জ্ঞান লাভ
করেন। ইন্টারভার্টেব্রাল ডিস্কের অস্তিত্ব এবং এর মৌলিক গঠন এই সময়েই জানা যায়।
২. কার্যকারিতা নিয়ে সীমিত জ্ঞান: যদিও ডিস্কের গঠন সম্পর্কে জানা গিয়েছিল, এর কাজ কী বা এটি কিভাবে
ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে, সে সম্পর্কে ধারণা সীমিত ছিল। ডিস্ককে মূলত মেরুদণ্ডের কশেরুকাগুলোকে ধরে রাখার
একটি "প্যাড" হিসেবে দেখা হতো। মেরুদণ্ডের ব্যথার বেশিরভাগ কারণকেই পেশী,
হাড় বা স্নায়ুর সাধারণ প্রদাহ হিসেবে ধরা হতো।
১. ক্লিনিক্যাল পর্যবেক্ষণ: এই সময়ে কিছু চিকিৎসক, বিশেষ করে নিউরোলজিস্ট এবং
অর্থোপেডিক সার্জনরা লক্ষ্য করেন যে, কিছু রোগীর মেরুদণ্ডের ব্যথা এবং স্নায়বিক উপসর্গ (যেমন সায়াটিকা) নির্দিষ্ট নড়াচড়ার সাথে সম্পর্কিত
এবং তা মেরুদণ্ডের ক্ষতির ইঙ্গিত দেয়।
২. প্রথম বর্ণনা: ১৮৯৫ সালে, জার্মান সার্জন Hermann Schmorl মেরুদণ্ডের ডিস্কের ক্ষয় এবং এর কিছু অস্বাভাবিকতা
বর্ণনা করেন, যা পরবর্তীতে "শ্মর্ল'স নোডুলস" (Schmorl's nodes) নামে পরিচিত হয়। যদিও এটি ডিস্ক হার্নিয়েশন ছিল না, এটি ডিস্কের
প্যাথলজি সম্পর্কে প্রথম দিকের ধারণার জন্ম দেয়।
৩. ডিস্ক প্রলাপস শনাক্তকরণ: এই সময়ের দিকে কিছু ক্ষেত্রে অটোপসি (ময়নাতদন্ত) করার সময় ডিস্কের টিস্যু
মেরুদণ্ডের ক্যানালে বেরিয়ে আসার ঘটনা পরিলক্ষিত হয়, যা ডিস্কের ক্ষতির সাথে স্নায়বিক উপসর্গের যোগসূত্র স্থাপন করে।
১. Key Contribution: Mixter and Barr (1934): ১৯৩০-এর দশক পর্যন্ত, সায়াটিকা
বা মেরুদণ্ডের স্নায়বিক সমস্যার মূল কারণ হিসেবে মেরুদণ্ডের টিউমার, সংক্রমণ বা বাতকে দায়ী করা হতো। ১৯৩৪ সালে, নিউরোসার্জন
ড. উইলিয়াম মিক্সটার (Dr. William Mixter) এবং অর্থোপেডিক সার্জন ড. জোসেফ বার (Dr. Joseph Barr) বোস্টনের ম্যাসাচুসেটস
জেনারেল হাসপাতালে একটি যুগান্তকারী গবেষণা প্রকাশ করেন।
(ক) তারা স্পষ্টভাবে দেখান যে, বেশিরভাগ সায়াটিকা এবং কোমর ব্যথার কারণ হলো ইন্টারভার্টেব্রাল ডিস্কের হার্নিয়েশন, যা মেরুদণ্ডের
স্নায়ুমূলের উপর চাপ সৃষ্টি করে।
(খ) তারা সফলভাবে হার্নিয়েটেড ডিস্ক অপসারণের জন্য সার্জারি করেন এবং রোগীদের উপসর্গ থেকে মুক্তি দেন। এটি চিকিৎসা বিজ্ঞানের
ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক ছিল, যা পিএলআইডি-কে একটি স্বতন্ত্র রোগ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং এর সার্জিক্যাল চিকিৎসার পথ খুলে দেয়।
২. মাইয়েলোগ্রাফির ব্যবহার: এই সময়ে মাইয়েলোগ্রাফি (Myelography) নামক এক প্রকার এক্স-রে পরীক্ষা প্রচলিত
হয়, যেখানে মেরুদণ্ডের ক্যানালে কনট্রাস্ট ডাই (রঞ্জক) ইনজেকশন দিয়ে ডিস্ক হার্নিয়েশনকে দৃশ্যমান করা যেত। এটি রোগ নির্ণয়ে সহায়তা করত।
সিটি স্ক্যান ও এমআরআই (CT Scan & MRI): ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে সিটি স্ক্যান (CT Scan) এবং বিশেষ করে এমআরআই (MRI) -এর আবিষ্কার পিএলআইডি রোগ নির্ণয়ে বিপ্লব ঘটায়। এই প্রযুক্তিগুলো ডিস্কের অবস্থা, এর প্রলাপসের মাত্রা এবং স্নায়ুর উপর চাপ অত্যন্ত নির্ভুলভাবে দেখাতে সক্ষম হয়, যা পূর্বে সম্ভব ছিল না।
১. সার্জিক্যাল পদ্ধতি: মাইক্রোডিস্কেক্টমি (Microdiscectomy) -র মতো ন্যূনতম
আক্রমণাত্মক সার্জিক্যাল পদ্ধতিগুলির বিকাশ হয়, যা বড় অস্ত্রোপচারের তুলনায় দ্রুত পুনরুদ্ধার এবং কম জটিলতা নিশ্চিত করে।
২. অ-সার্জিক্যাল চিকিৎসা: ফিজিওথেরাপি, কাইরোপ্র্যাকটিক কেয়ার, ঔষধপত্র এবং এপিডুরাল
ইনজেকশনের মতো অ-সার্জিক্যাল চিকিৎসা পদ্ধতির কার্যকারিতা সম্পর্কে আরও গভীর গবেষণা হয়। অধিকাংশ পিএলআইডি
রোগী সার্জারি ছাড়াই সুস্থ হয়ে ওঠেন বলে প্রমাণিত হয়।
১. সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি: বর্তমানে পিএলআইডি চিকিৎসায় একটি সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি
গ্রহণ করা হয়, যেখানে ব্যথার ধরন, ইমেজিং ফলাফল এবং রোগীর সামগ্রিক জীবনযাত্রাকে বিবেচনা করে ব্যক্তিগতকৃত চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি করা হয়।
২. প্রতিরোধ ও পুনর্বাসন: রোগ প্রতিরোধ এবং সঠিক পুনর্বাসনের উপর জোর দেওয়া হয়, যাতে ডিস্কের
আরও ক্ষতি রোধ করা যায় এবং রোগীর জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়।
৩. নতুন প্রযুক্তি ও গবেষণা: স্টেম সেল থেরাপি, ডিস্ক রিপ্লেসমেন্ট এবং অন্যান্য বায়োলজিক্যাল থেরাপির
মতো নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা চলছে, যা ভবিষ্যতে পিএলআইডি চিকিৎসায় আরও নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।
সংক্ষেপে, পিএলআইডি রোগের ইতিহাস মানবদেহের গঠন সম্পর্কে আমাদের ক্রমবর্ধমান জ্ঞান এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানের ধারাবাহিক
অগ্রগতির প্রতিফলন। প্রাচীনকালের অস্পষ্ট ধারণা থেকে শুরু করে আধুনিক এমআরআই ভিত্তিক সুনির্দিষ্ট রোগ নির্ণয় এবং উন্নত
চিকিৎসা পদ্ধতি - এই রোগ সম্পর্কে আমাদের বোঝাপড়া এবং চিকিৎসার ক্ষমতা যুগ যুগ ধরে বিকশিত হয়েছে।