প্যানক্রিয়াটাইটিস রোগের ইতিহাস বেশ প্রাচীন এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতির সাথে এর সম্পর্কে জ্ঞানও বিকশিত হয়েছে। অগ্ন্যাশয় এবং এর রোগ সম্পর্কে মানুষের ধারণা কীভাবে সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয়েছে, তা সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
অগ্ন্যাশয় (Pancreas) শব্দের উৎপত্তি: 'Pancreas'
শব্দটি প্রাচীন গ্রীক শব্দ 'pan' (সব) এবং 'kreas' (মাংস) থেকে এসেছে, যার অর্থ "সব মাংস"। এই
নামকরণটি অগ্ন্যাশয়ের কোনো হাড় বা তরুণাস্থি না থাকায় এর নরম গঠনের জন্য করা হয়েছে।
প্রথম বর্ণনা: খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে আলেকজান্দ্রিয়ার চিকিৎসাবিদ্যার প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে
পরিচিত হিরোফিলাস অফ চালসিডন (Herophilus of Chalcedon) অগ্ন্যাশয়ের প্রথম বর্ণনা দেন। তবে রুফাস
অফ এফেসাস (Rufus of Ephesus) অঙ্গটির নামকরণ করেন।
১৬শ শতাব্দী- ১৬শ শতাব্দীর মধ্যে অগ্ন্যাশয়কে এমন একটি নালীবিহীন গ্রন্থি হিসেবে বর্ণনা করা হয় যেখানে ডুওডেনামের কাইম (chyme) প্রবেশ করে।
১৬৫২ সালে ডাচ সার্জন এবং অ্যানাটমি লেকচারার নিকোলাস টুলপ (Nicolaes Tulp) প্যানক্রিয়াটাইটিসের প্রথম বর্ণনা দেন। রেমব্র্যান্টের বিখ্যাত চিত্রকর্ম "দ্য অ্যানাটমি লেসন অফ ড. নিকোলাস টুলপ"-এর বিষয়বস্তু হিসেবে তিনি স্মরণীয়। এর প্রায় তিন-চতুর্থাংশ শতাব্দী পরে, ১৬৭৯ সালে থিওফিল বোনেট (Théophile Bonet) জন্ডিসে আক্রান্ত একজন রোগীর ময়নাতদন্তের সময় অগ্ন্যাশয়ে পাথর (pancreatic calculi) দেখতে পান, যা অগ্ন্যাশয়ের রোগের সাথে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ ছিল।
১৮০৩ সালে ক্রনিক প্যানক্রিয়াটাইটিসের ক্লিনিক্যাল লক্ষণ: এন্টোইন
পোরটাল (Antoine Portal) ক্রনিক প্যানক্রিয়াটাইটিসের ক্লিনিক্যাল লক্ষণগুলোর প্রথম বর্ণনা দেন।
অ্যালকোহলের ভূমিকা: ১৮১৫ সালে ফ্লিশম্যান (Fleischman) অতিরিক্ত মদ্যপানের সাথে অগ্ন্যাশয়ের
রোগের সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়ে অনুমান করেন।
রোগের প্রকারভেদ: ১৯শ শতাব্দীতে প্যানক্রিয়াটাইটিসকে রক্তক্ষরণজনিত (hemorrhagic), পূঁজযুক্ত
(suppurative) এবং গ্যাংগ্রিনাস (gangrenous) হিসেবে আরও বিশদভাবে বর্ণনা করা হয়।
প্যানক্রিয়াটাইটিসের কারণ চিহ্নিতকরণ: এই সময়ে পিত্তথলির পাথর (gallstones) এবং অ্যালকোহল
সেবনকে প্যানক্রিয়াটাইটিসের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা শুরু হয়।
তব্র প্যানক্রিয়াটাইটিসের প্রথম ময়নাতদন্ত বর্ণনা: ১৮৮২ সালে তীব্র প্যানক্রিয়াটাইটিসের প্রথম
ময়নাতদন্তে বর্ণনা করা হয়, যখন দীর্ঘস্থায়ী প্যানক্রিয়াটাইটিসের বর্ণনা আসে ১৯৪৬ সালে।
"ক্রনিক রিল্যাপ্সিং প্যানক্রিয়াটাইটিস" শব্দটির প্রচলন: ১৯৪৬ সালে কমফোর্ট (Comfort) "ক্রনিক রিল্যাপ্সিং
প্যানক্রিয়াটাইটিস" শব্দটি ব্যবহার করেন এবং এর ছয় বছর পরে বংশগত প্যানক্রিয়াটাইটিসের (hereditary pancreatitis) বর্ণনা দেন।
ঝুঁকি নির্ণয় ব্যবস্থা: ১৯২৭ সালে এক্স-রে'র মাধ্যমে অগ্ন্যাশয়ের ক্যালসিফিকেশন (calcifications) দেখে
প্যানক্রিয়াটাইটিস নির্ণয়ের প্রথম ইমেজিং ডায়াগনসিস করা হয়।
severity scoring system (রোগের তীব্রতা মূল্যায়নের পদ্ধতি): ১৯৭৭ সালে র্যানসন এবং পাস্টারনাক
(Ranson and Pasternack) প্যানক্রিয়াটাইটিসের তীব্রতা নির্ণয়ের জন্য ৪৩টি চলককে (variables) সংক্ষেপ করে ১১টি চেলকে
আনেন, যা রোগের পূর্বাভাস এবং চিকিৎসা পরিকল্পনায় সহায়ক হয়। ১৯৮৯ সালে APACHE-II (Acute Physiology and Chronic
Health Enquiry) স্কোরিং সিস্টেমটি প্যানক্রিয়াটাইটিসের তীব্রতা মূল্যায়নে প্রয়োগ করা হয়।
জেনেটিক কারণ এবং উন্নত চিকিৎসা; বর্তমানে, প্যানক্রিয়াটাইটিসের কারণ হিসেবে জেনেটিক কারণ, অটোইমিউন রোগ এবং কিছু নির্দিষ্ট ঔষধের ভূমিকা সম্পর্কে আরও গবেষণা হচ্ছে। উন্নত ইমেজিং কৌশল যেমন সিটি স্ক্যান (CT scan), এমআরআই (MRI) এবং এন্ডোস্কোপিক আল্ট্রাসাউন্ড (EUS) রোগের সঠিক নির্ণয়ে সাহায্য করছে। একই সাথে, ব্যথা ব্যবস্থাপনা, তরল থেরাপি, পুষ্টি সহায়তা এবং নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচার সহ চিকিৎসার পদ্ধতিতেও ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। প্যানক্রিয়াটাইটিসের ইতিহাস দেখায় যায় যে, যুগ যুগ ধরে এই রোগের কারণ, লক্ষণ এবং চিকিৎসা বোঝার জন্য বিজ্ঞানীরা ও চিকিৎসকরা নিরন্তর চেষ্টা করেছেন, যার ফলস্বরূপ আজকের উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।