শারীরবৃত্তীয় বা কাঠামোগত সমস্যা বলতে বোঝায়, পুরুষের প্রজননতন্ত্রের গঠনগত কোনো ত্রুটি বা বাধার কারণে শুক্রাণু উৎপাদন, পরিবহন বা বীর্যপাতের প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়া। এই ধরনের সমস্যা শুক্রাণুর গুণগত মান বা সংখ্যা স্বাভাবিক থাকা সত্ত্বেও বন্ধ্যাত্বের কারণ হতে পারে। এখানে পুরুষ বন্ধ্যাত্বের প্রধান শারীরবৃত্তীয় বা কাঠামোগত সমস্যাগুলোর বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হলো:
সংজ্ঞা: ভেরিকোসিল হলো অণ্ডকোষ থেকে রক্ত বহনকারী শিরাগুলো (pampiniform plexus) অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যাওয়া বা প্রসারিত হওয়া। এটি অনেকটা পায়ের ভ্যারিকোজ ভেইনের মতো। এটি সাধারণত বাম অণ্ডকোষে বেশি দেখা যায়।
(ক) তাপমাত্রা বৃদ্ধি: ফুলে থাকা শিরাগুলো অণ্ডকোষের তাপমাত্রা
বাড়িয়ে দেয়। আমাদের শরীর শুক্রাণু উৎপাদন এবং সংরক্ষণের জন্য স্বাভাবিক শরীরের তাপমাত্রার চেয়ে কম তাপমাত্রা
(সাধারণত ২-৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস কম) প্রয়োজন হয়। তাপমাত্রা বেড়ে গেলে শুক্রাণু উৎপাদন এবং তার গুণগত মান
(যেমন - গতিশীলতা ও আকার) মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
(খ) রক্ত প্রবাহে বাধা: এটি অণ্ডকোষে রক্ত প্রবাহের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, যা শুক্রাণু
উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি ও অক্সিজেন সরবরাহ ব্যাহত করে।
চিকিৎসা: ভেরিকোসিল একটি প্রধান চিকিৎসাযোগ্য কারণ। এর জন্য সাধারণত অস্ত্রোপচার
(microsurgical varicocelectomy) বা এম্বোলাইজেশন (embolization) করা হয়, যা ফুলে থাকা শিরাগুলো বন্ধ
করে দেয় এবং অণ্ডকোষের তাপমাত্রা স্বাভাবিক করে। সঠিক চিকিৎসার পর অনেক পুরুষের উর্বরতা ফিরে আসে।
সংজ্ঞা: শুক্রাণু অণ্ডকোষে তৈরি হওয়ার পর কিছু নালীর (যেমন - এপিডিডাইমিস, ভাস ডিফারেন্স এবং ইজাকুলেটরি ডাক্ট) মাধ্যমে বীর্যের সাথে মিশে বাইরে আসে। যদি এই নালীগুলোতে কোনো ধরনের বাধা থাকে, তাহলে শুক্রাণু বীর্যে মিশতে পারে না, যা অ্যাজোস্পার্মিয়া (বীর্যে শুক্রাণুর অনুপস্থিতি) সৃষ্টি করে।
(ক) পূর্বের সংক্রমণ: গনোরিয়া বা ক্ল্যামিডিয়ার মতো যৌন
সংক্রামিত রোগ এই নালীগুলোতে প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে, যা পরবর্তীতে বাধায় পরিণত হয়।
(খ) জন্মগত ত্রুটি: কিছু পুরুষের জন্মগতভাবে ভাস ডিফারেন্স অনুপস্থিত থাকতে পারে
(Congenital Bilateral Absence of the Vas Deferens - CBAVD), যা সিস্টিক ফাইব্রোসিসের মতো জেনেটিক
রোগের সাথে সম্পর্কিত হতে পারে।
(গ) অস্ত্রোপচার: হার্নিয়া বা প্রোস্টেট সংক্রান্ত অস্ত্রোপচারের কারণেও এই নালীগুলোর ক্ষতি হতে পারে।
(ঘ) ভ্যাসেকটমি (Vasectomy): জন্ম নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে পুরুষদের এই অস্ত্রোপচার করা
হয়, যেখানে ভাস ডিফারেন্স কেটে দেওয়া হয়।
চিকিৎসা: এই বাধার অবস্থান এবং কারণের ওপর ভিত্তি করে অস্ত্রোপচার করা হয়। মাইক্রোসার্জারির
মাধ্যমে ব্লক খুলে দেওয়া বা নালীগুলো পুনরায় জোড়া লাগানো সম্ভব হতে পারে। যদি অস্ত্রোপচার সম্ভব না হয়, তাহলে শুক্রাণু
সরাসরি অণ্ডকোষ বা এপিডিডাইমিস থেকে সংগ্রহ করে সহায়ক প্রজনন পদ্ধতি (Assisted Reproductive Technology -
ART), যেমন - আইসিএসআই (ICSI), ব্যবহার করা হয়।
সংজ্ঞা: সাধারণত জন্মের আগে বা জন্মের পরপরই অণ্ডকোষগুলো পেটের ভেতর থেকে অণ্ডথলিতে (scrotum) নেমে আসে। যদি এক বা উভয় অণ্ডকোষ সঠিক সময়ে নিচে না নামে, তাহলে এই অবস্থাকে ক্রিপ্টোরকিডিজম বলা হয়।
(ক) উচ্চ তাপমাত্রা: অণ্ডকোষ পেটের ভেতরে উচ্চ তাপমাত্রায় থাকার কারণে শুক্রাণু
উৎপাদন গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
(খ) শুক্রাণুর ক্ষতি: উচ্চ তাপমাত্রা শুক্রাণু উৎপাদনে বাধা দেয় বা উৎপাদিত শুক্রাণুর গুণগত মান নষ্ট করে দেয়।
চিকিৎসা: সাধারণত শৈশবেই অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অণ্ডকোষকে অণ্ডথলিতে নামিয়ে আনা হয় (Orchiopexy)। যদি
এটি শৈশবে করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতের উর্বরতা ক্ষতির সম্ভাবনা কমে যায়। কিন্তু প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় ধরা পড়লে শুক্রাণু
উৎপাদনে স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে।
যদিও এটি সরাসরি গঠনগত ত্রুটি নয়, কিছু শারীরবৃত্তীয় কারণে বীর্যপাতের সমস্যা হতে পারে।
(ক) রেট্রোগ্রেড ইজাকুলেশন (Retrograde Ejaculation): এই অবস্থায় বীর্য লিঙ্গ থেকে বাইরে না এসে মূত্রাশয়ের
(bladder) ভেতরে চলে যায়। এর কারণ হতে পারে ডায়াবেটিস, স্নায়ুর ক্ষতি, নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ বা প্রোস্টেট সার্জারি।
(খ) ইরেক্টাইল ডিসফাংশন (Erectile Dysfunction): লিঙ্গ সঠিকভাবে উত্থান না হওয়ায় যৌন মিলনে সমস্যা হয়,
যা শুক্রাণুকে নারীর প্রজনন নালীতে প্রবেশ করাতে বাধা দেয়। শারীরবৃত্তীয় বা কাঠামোগত সমস্যা নির্ণয় করতে সাধারণত শারীরিক পরীক্ষা,
আল্ট্রাসাউন্ড এবং প্রয়োজনে অন্যান্য ইমেজিং টেস্ট (যেমন - MRI) করা হয়। সঠিক রোগ নির্ণয়ের পর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক প্রয়োজনীয়
চিকিৎসা বা সার্জারির পরামর্শ দিতে পারেন, যা বন্ধ্যাত্ব দূর করতে সাহায্য করে।