কিছু জিনগত রোগ, যেমন - সিস্টিক ফাইব্রোসিস বা ক্রোমোজোম-সংক্রান্ত অস্বাভাবিকতা পুরুষ বন্ধ্যাত্বের কারণ হতে পারে। জিনগত কারণগুলো পুরুষ বন্ধ্যাত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রায়শই অপরিবর্তনীয় দিক। কিছু জন্মগত বা বংশগত জিনগত ত্রুটি শুক্রাণু উৎপাদন বা তার পরিবহনের প্রক্রিয়াকে গুরুতরভাবে ব্যাহত করতে পারে। এই ধরনের সমস্যাগুলো সাধারণত পুরুষদের মধ্যে তুলনামূলকভাবে কম দেখা গেলেও, বন্ধ্যাত্বের কারণ নির্ণয়ের সময় এগুলো বিবেচনা করা জরুরি।
জিনগত কারণগুলো বিভিন্ন স্তরে শুক্রাণু উৎপাদনকে প্রভাবিত করতে পারে। নিচে এর প্রধান কিছু দিক বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হলো:
আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষে সাধারণত ২৩ জোড়া ক্রোমোজোম থাকে। এর মধ্যে
২২ জোড়া অটোজোম এবং ১ জোড়া সেক্স ক্রোমোজোম (পুরুষদের ক্ষেত্রে XY, মহিলাদের ক্ষেত্রে XX)। এই ক্রোমোজোমের
সংখ্যা বা গঠনে কোনো ত্রুটি থাকলে তা বন্ধ্যাত্বের কারণ হতে পারে।
(ক) ক্লাইনফেল্টার সিনড্রোম (Klinefelter Syndrome): এটি সবচেয়ে পরিচিত ক্রোমোজোম-সংক্রান্ত
অস্বাভাবিকতা, যা পুরুষ বন্ধ্যাত্বের অন্যতম প্রধান কারণ। এই সিনড্রোমে পুরুষের শরীরে একটি অতিরিক্ত X ক্রোমোজোম থাকে
(সাধারণত 47, XXY)।
প্রভাব: অতিরিক্ত X ক্রোমোজোমের কারণে অণ্ডকোষের স্বাভাবিক বিকাশ হয় না। এর ফলে শুক্রাণু
উৎপাদন প্রায় বন্ধ হয়ে যায় (Non-obstructive Azoospermia) বা খুবই কম হয়। পাশাপাশি, পুরুষের শরীরে টেস্টোস্টেরনের
মাত্রাও কমে যায়।
লক্ষণ: লম্বা এবং সরু গঠন, স্তনের টিস্যু বৃদ্ধি (gynecomastia), মুখ ও শরীরের লোম কমে যাওয়া,
এবং ছোট অণ্ডকোষ।
চিকিৎসা: এই ক্ষেত্রে শুক্রাণু উৎপাদন করা সম্ভব না হলেও, কিছু ক্ষেত্রে অণ্ডকোষ থেকে মাইক্রো-
টিইএসই (micro-TESE) পদ্ধতির মাধ্যমে শুক্রাণু পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, যা আইসিএসআই (ICSI) এর জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে।
(খ) Y ক্রোমোজোমের মাইক্রোডিলেশন (Y Chromosome Microdeletions): Y ক্রোমোজোমে কিছু
নির্দিষ্ট জিনের অনুপস্থিতি বা মুছে যাওয়া (deletion) শুক্রাণু উৎপাদনকে সরাসরি প্রভাবিত করে।
প্রভাব: Y ক্রোমোজোমের AZF (Azoospermia Factor) অঞ্চলে শুক্রাণু উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয়
জিনগুলো থাকে। এই অঞ্চলের AZFa, AZFb, বা AZFc জিনে কোনো ত্রুটি থাকলে শুক্রাণু উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে যেতে
পারে বা একেবারেই বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
(খ) AZFa ও AZFb ডিলেশন: এর ফলে সাধারণত কোনো শুক্রাণু তৈরি হয় না (Non-obstructive Azoospermia)।
(খ) AZFc ডিলেশন: এটি শুক্রাণু উৎপাদনকে গুরুতরভাবে কমিয়ে দেয় (Oligospermia), তবে শুক্রাণু পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
চিকিৎসা: AZFa এবং AZFb ডিলেশনের ক্ষেত্রে শুক্রাণু পাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই। তবে AZFc ডিলেশনের
ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে শুক্রাণু পাওয়ার সুযোগ থাকতে পারে।
কিছু জন্মগত রোগ একক জিনের ত্রুটির কারণে হয় এবং পুরুষদের উর্বরতা প্রভাবিত করে।
(ক) সিস্টিক ফাইব্রোসিস (Cystic Fibrosis - CF): এই জিনগত রোগের কারণে শরীর থেকে নিঃসৃত
তরল (যেমন - বীর্য) ঘন ও আঠালো হয়ে যায়।
প্রভাব: সিস্টিক ফাইব্রোসিসে আক্রান্ত প্রায় ৯৮% পুরুষের ভাস ডিফারেন্স (vas deferens) জন্মগতভাবে
অনুপস্থিত থাকে (Congenital Bilateral Absence of the Vas Deferens - CBAVD)। ভাস ডিফারেন্স হলো সেই নালী, যা
শুক্রাণুকে অণ্ডকোষ থেকে বীর্যথলিতে নিয়ে আসে। এর অনুপস্থিতির কারণে শুক্রাণু তৈরি হওয়া সত্ত্বেও বীর্যের সাথে মিশতে পারে
না, যা অবস্ট্রাকটিভ অ্যাজোস্পার্মিয়া সৃষ্টি করে।
চিকিৎসা: এই পুরুষদের ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে এপিডিডাইমিস বা অণ্ডকোষ থেকে শুক্রাণু সংগ্রহ
করা হয় (যেমন - PESA, TESA) এবং ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন (IVF) বা আইসিএসআই (ICSI) এর মাধ্যমে গর্ভধারণ সম্ভব।
(ক) কালম্যান সিনড্রোম (Kallmann Syndrome): এটি একটি জেনেটিক রোগ, যা মস্তিষ্কে GnRH
(Gonadotropin-Releasing Hormone) হরমোনের উৎপাদনকে প্রভাবিত করে।
প্রভাব: GnRH হরমোন FSH এবং LH হরমোন উৎপাদনকে নিয়ন্ত্রণ করে। GnRH-এর অভাবে FSH এবং
LH-এর মাত্রাও কমে যায়, যার ফলে টেস্টোস্টেরন এবং শুক্রাণু উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে যায়।
লক্ষণ: এই রোগে আক্রান্ত পুরুষদের যৌবনের লক্ষণগুলো দেরিতে বা একেবারেই প্রকাশ পায় না (যেমন
- পেশি বৃদ্ধি, কণ্ঠস্বরের পরিবর্তন) এবং তাদের ঘ্রাণশক্তিও কমে যেতে পারে।
চিকিৎসা: এই রোগের জন্য হরমোন থেরাপি (যেমন - GnRH ইনজেকশন বা FSH/LH ইনজেকশন) বেশ
কার্যকর হতে পারে, যা শুক্রাণু উৎপাদন পুনরায় শুরু করতে সাহায্য করে।
জিনগত কারণ নির্ণয়ের জন্য সাধারণত ক্যারিয়োটাইপিং (karyotyping) এবং Y ক্রোমোজোম মাইক্রোডিলেশন টেস্ট করা হয়। সিস্টিক ফাইব্রোসিসের ক্ষেত্রে সিএফটিআর (CFTR) জিনের মিউটেশন পরীক্ষা করা হয়। যদি জিনগত কারণে বন্ধ্যাত্ব ধরা পড়ে, তবে এর চিকিৎসা কিছুটা সীমিত। তবে আধুনিক সহায়ক প্রজনন পদ্ধতি (ART), যেমন - আইসিএসআই (ICSI), অনেক পুরুষকে সন্তান ধারণের সুযোগ করে দিয়েছে, যেখানে শুক্রাণু সরাসরি ডিম্বাণুর মধ্যে ইনজেকশন দেওয়া হয়। এটি মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে, বন্ধ্যাত্বের জিনগত কারণগুলো সন্তানের মধ্যে স্থানান্তরিত হতে পারে। তাই, চিকিৎসার আগে জেনেটিক কাউন্সেলিং নেওয়া জরুরি, যাতে ভবিষ্যত ঝুঁকি সম্পর্কে দম্পতি সচেতন থাকতে পারেন।