কিডনিতে পাথর (Kidney Stones) হলো খনিজ পদার্থ এবং লবণের কঠিন জমাট বাঁধা, যা কিডনির অভ্যন্তরে গঠিত হয়। এই পাথরগুলো আকারে খুবই ছোট বালুকণার মতো হতে পারে, আবার গল্ফ বলের মতো বড়ও হতে পারে। এগুলো মূত্রনালীর (urinary tract) যেকোনো অংশে ব্যথা, সংক্রমণ বা বাধা সৃষ্টি করতে পারে। কিডনিতে পাথর সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা:
কিডনিতে পাথর, যা রেনাল ক্যালকুলি (Renal Calculi) বা নেফ্রোলিথিয়াসিস (Nephrolithiasis) নামেও পরিচিত, হলো প্রস্রাবের মধ্যে থাকা বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থের কঠিন স্ফটিক। সাধারণত, প্রস্রাব এই পদার্থগুলোকে দ্রবীভূত রাখে এবং শরীর থেকে বের করে দেয়। কিন্তু যখন প্রস্রাবে এই পদার্থগুলোর ঘনত্ব বেড়ে যায়, তখন সেগুলো স্ফটিক তৈরি করে এবং একে অপরের সাথে জমাট বেঁধে পাথর তৈরি করে।
চার ধরনের প্রধান কিডনি পাথর রয়েছে:
(১) ক্যালসিয়াম পাথর (Calcium Stones):
(ক) ক্যালসিয়াম অক্সালেট (Calcium Oxalate):
এটি সবচেয়ে সাধারণ প্রকারের পাথর (প্রায় 80% ক্ষেত্রে)। অক্সালেট একটি প্রাকৃতিক পদার্থ যা বিভিন্ন খাবার
(যেমন পালং শাক, চকোলেট, বাদাম) এবং লিভার দ্বারা উৎপন্ন হয়। উচ্চ মাত্রার ভিটামিন ডি, অন্ত্রের বাইপাস
সার্জারি এবং কিছু বিপাকীয় রোগ এই পাথরের ঝুঁকি বাড়ায়।
(খ) ক্যালসিয়াম ফসফেট (Calcium Phosphate): এই ধরনের পাথর কম সাধারণ এবং
সাধারণত বিপাকীয় অবস্থার (যেমন রেনাল টিউবুলার অ্যাসিডোসিস) কারণে হয়।
(২) স্ট্রুভাইট পাথর (Struvite Stones): এই পাথরগুলো সাধারণত মূত্রনালীর সংক্রমণের (Urinary Tract Infection - UTI) প্রতিক্রিয়ায় গঠিত হয়। মূত্রনালীর সংক্রমণ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া প্রস্রাবকে ক্ষারীয় করে তোলে, যা ম্যাগনেসিয়াম অ্যামোনিয়াম ফসফেট (স্ট্রুভাইট) স্ফটিক তৈরি করতে সাহায্য করে। এই পাথরগুলো দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে এবং বেশ বড় আকার ধারণ করতে পারে।
(৩) ইউরিক অ্যাসিড পাথর (Uric Acid Stones): এই পাথরগুলো ইউরিক অ্যাসিড থেকে তৈরি হয়। যাদের শরীর থেকে অতিরিক্ত ইউরিক অ্যাসিড নির্গত হয়, যারা পর্যাপ্ত জল পান করেন না, বা যাদের প্রস্রাব অতিরিক্ত অম্লীয় (যেমন গাউট আক্রান্ত ব্যক্তি, কেমোথেরাপি গ্রহণকারী ব্যক্তি বা যারা প্রচুর পরিমাণে প্রাণীজ প্রোটিন গ্রহণ করেন) তাদের এই পাথর হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
(৪) সিস্টিন পাথর (Cystine Stones): এটি একটি বিরল প্রকারের পাথর যা জেনেটিক ত্রুটির কারণে হয়। এই ত্রুটির ফলে কিডনি একটি নির্দিষ্ট অ্যামিনো অ্যাসিড (সিস্টিন) প্রস্রাবে অতিরিক্ত পরিমাণে বের করে দেয়, যা সিস্টিন পাথর তৈরি করে।
(ক) অপর্যাপ্ত জল পান: এটি সবচেয়ে সাধারণ কারণ। কম জল পান
করলে প্রস্রাব ঘন হয় এবং খনিজ পদার্থ জমাট বাঁধার সম্ভাবনা বাড়ে।
(খ) খাদ্যাভ্যাস: অতিরিক্ত লবণ, চিনি, এবং প্রাণীজ প্রোটিন গ্রহণ। অক্সালেট সমৃদ্ধ খাবার
(যেমন পালং শাক, বীট, বাদাম, চকোলেট, চা)।
(গ) স্থূলতা: স্থূলতা কিডনি পাথর হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়।
(ঙ) নির্দিষ্ট কিছু চিকিৎসা অবস্থা:(১) ক্রোহন'স ডিজিজ (Crohn's disease) বা আলসারেটিভ কোলাইটিস
(ulcerative colitis) এর মতো হজমতন্ত্রের রোগ।
(২) হাইপারপ্যারাথাইরয়েডিজম (Hyperparathyroidism)।
(৩) রেনাল টিউবুলার অ্যাসিডোসিস (Renal Tubular Acidosis)।
(৪) গাউট (Gout)।
(৫) পুনরাবৃত্ত মূত্রনালীর সংক্রমণ।
(চ) ওষুধ: কিছু নির্দিষ্ট ওষুধ (যেমন ডাইউরেটিকস, অ্যান্টি-সিজার ড্রাগস, ক্যালসিয়াম-ভিত্তিক অ্যান্টাসিড)
কিডনি পাথর হওয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
(ছ) পারিবারিক ইতিহাস: যদি পরিবারের কারো কিডনিতে পাথর থাকে, তবে আপনারও ঝুঁকি বেশি।
কিডনিতে পাথরের আকার এবং অবস্থানের উপর নির্ভর করে লক্ষণগুলো পরিবর্তিত হতে পারে। ছোট পাথরগুলো কোনো লক্ষণ ছাড়াই প্রস্রাবের সাথে বেরিয়ে যেতে পারে। তবে যখন পাথর মূত্রনালীতে আটকে যায় বা নড়াচড়া করে, তখন নিম্নলিখিত লক্ষণগুলো দেখা দিতে পারে:
(ক) তীব্র ব্যথা (Renal Colic): এটি সবচেয়ে পরিচিত লক্ষণ। পিঠের একপাশে,
পাঁজরের নিচে, তলপেটে বা কুঁচকিতে তীব্র, ধারালো ব্যথা হয়। ব্যথা হঠাৎ শুরু হয় এবং তীব্রতা পরিবর্তিত হতে পারে।
(খ) প্রস্রাবে রক্ত (Hematuria): প্রস্রাবের সাথে রক্ত আসতে পারে, যা লাল, গোলাপী বা বাদামী রঙের হতে পারে।
(গ) প্রস্রাবের সময় ব্যথা বা জ্বালাপোড়া (Dysuria):
(ঘ) বমি বমি ভাব এবং বমি (Nausea and Vomiting):
(ঙ) ঘন ঘন প্রস্রাব করার তাগিদ (Frequent Urination):
(চ) মেঘলা বা দুর্গন্ধযুক্ত প্রস্রাব (Cloudy or Foul-smelling Urine): এটি সংক্রমণের লক্ষণ হতে পারে।
(ছ) জ্বর এবং ঠাণ্ডা লাগা (Fever and Chills): যদি পাথর সংক্রমণের কারণ হয়।
রোগ নির্ণয়:
(জ) শারীরিক পরীক্ষা এবং ইতিহাস: চিকিৎসক আপনার লক্ষণ এবং চিকিৎসা ইতিহাস সম্পর্কে জানতে চাইবেন।
(ঝ) মূত্র পরীক্ষা (Urinalysis): প্রস্রাবে রক্ত, পুঁজ বা অতিরিক্ত খনিজ পদার্থ আছে কিনা তা দেখা হয়।
(ঞ) রক্ত পরীক্ষা (Blood Test): কিডনির কার্যকারিতা এবং রক্তের খনিজ পদার্থের মাত্রা (যেমন ক্যালসিয়াম, ইউরিক অ্যাসিড) পরীক্ষা করা হয়।
(ট) ইমেজিং পরীক্ষা:
(১) এক্স-রে (X-ray): কিছু ধরনের পাথর দেখা যায়।
(২) আল্ট্রাসাউন্ড (Ultrasound): শব্দ তরঙ্গ ব্যবহার করে পাথর সনাক্ত করা হয়।
(৩) সিটি স্ক্যান (CT Scan): এটি সবচেয়ে সংবেদনশীল পরীক্ষা এবং ছোট পাথরও সনাক্ত করতে পারে।
চিকিৎসা পাথরের আকার, প্রকার এবং অবস্থানের উপর নির্ভর করে:
(১) ছোট পাথর (Small Stones):
(ক) জল পান: প্রচুর পরিমাণে জল পান করলে ছোট পাথর প্রস্রাবের সাথে বেরিয়ে যেতে পারে।
(খ) ব্যথানাশক: ব্যথা কমানোর জন্য ওভার-দ্য-কাউন্টার বা প্রেসক্রিপশনের ব্যথানাশক দেওয়া হতে পারে।
(গ) আলফা ব্লকার (Alpha Blocker): কিছু ওষুধ, যেমন ট্যামসুলোসিন, মূত্রনালীর পেশী শিথিল করে পাথর বের হতে সাহায্য করে।
(২) বড় পাথর বা জটিল পাথর (Large or Complicated Stones):
(ক) শক ওয়েভ লিথোট্রিপসি (Shock Wave Lithotripsy - SWL): বাইরে থেকে শক ওয়েভ প্রয়োগ করে পাথরকে ছোট ছোট টুকরোতে
ভেঙে দেওয়া হয়, যা পরে প্রস্রাবের সাথে বেরিয়ে যায়।
(খ) ইউরেটেরোস্কোপি (Ureteroscopy): একটি পাতলা, নমনীয় যন্ত্র (ইউরেটেরোস্কোপ) মূত্রনালী এবং মূত্রাশয় হয়ে ইউরেটারে প্রবেশ করানো হয়।
পাথর সনাক্ত করে লেজার দিয়ে ভেঙে দেওয়া হয় বা ছোট তারের ঝুড়ি দিয়ে বের করে আনা হয়।
(গ) পারকিউটেনিয়াস নেফ্রোলিথোটমি (Percutaneous Nephrolithotomy - PCNL): কিডনিতে একটি ছোট ছিদ্র করে একটি যন্ত্র প্রবেশ করানো হয়
এবং পাথর বের করে আনা হয় বা ভেঙে দেওয়া হয়। এটি বড় পাথরের জন্য ব্যবহৃত হয়।
(ঘ) ওপেন সার্জারি (Open Surgery): এটি খুব কমই ব্যবহৃত হয়, কেবল যখন অন্য পদ্ধতিগুলো অকার্যকর হয় বা পাথর খুব বড় হয়।
কিডনিতে পাথর প্রতিরোধের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ:
(ক) পর্যাপ্ত জল পান: প্রতিদিন ২-৩ লিটার জল পান করুন, যাতে প্রস্রাব হালকা হলুদ বা স্বচ্ছ থাকে।
(খ) লবণ এবং চিনি কম গ্রহণ: অতিরিক্ত লবণ এবং চিনি প্রস্রাবে ক্যালসিয়ামের মাত্রা বাড়াতে পারে।
(গ) সুষম খাদ্য: সুষম খাবার গ্রহণ করুন এবং অত্যধিক প্রাণীজ প্রোটিন এড়িয়ে চলুন।
(ঘ) অক্সালেট সমৃদ্ধ খাবার পরিমিত গ্রহণ: যদি ক্যালসিয়াম অক্সালেট পাথর হয়, তবে অক্সালেট সমৃদ্ধ খাবার পরিমিতভাবে গ্রহণ করুন।
(ঙ) সাইট্রেট পানীয়: লেবু জল বা কমলা লেবুর রস (প্রাকৃতিক সাইট্রেট সমৃদ্ধ) পাথর গঠনে বাধা দিতে পারে।
(চ) স্থূলতা নিয়ন্ত্রণ: ওজন নিয়ন্ত্রণ করুন।
(ছ) চিকিৎসা অবস্থার ব্যবস্থাপনা: যদি কিডনি পাথর হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায় এমন কোনো চিকিৎসা অবস্থা থাকে (যেমন গাউট), তবে সেগুলোর সঠিক চিকিৎসা করুন।
(জ) ওষুধের পর্যালোচনা: যদি এমন কোনো ওষুধ গ্রহণ করেন যা কিডনি পাথর হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়, তবে ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করুন।
কিডনিতে পাথর একটি কষ্টদায়ক অবস্থা হতে পারে, তবে সঠিক চিকিৎসা এবং প্রতিরোধের মাধ্যমে এর মোকাবিলা করা সম্ভব। যদি কিডনিতে পাথরের কোনো লক্ষণ থাকে,
তাহলে দ্রুত ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করা উচিত।