সাধারণত মূত্রনালী বা মূত্রাশয় থেকে ব্যাকটেরিয়া কিডনিতে প্রবেশ করলে এই সংক্রমণ হয়। এটি তীব্র ব্যথা, জ্বর এবং মূত্রত্যাগে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। কিডনি সংক্রমণ, যা পাইলোনেফ্রাইটিস (Pyelonephritis) নামে পরিচিত, একটি গুরুতর ধরণের মূত্রনালীর সংক্রমণ (Urinary Tract Infection - UTI)। এটি ঘটে যখন ব্যাকটেরিয়া মূত্রনালী (urethra) বা মূত্রাশয় (bladder) থেকে উপরের দিকে উঠে এসে এক বা উভয় কিডনিতে পৌঁছায়। এটি দ্রুত চিকিৎসা না করা হলে কিডনির স্থায়ী ক্ষতি বা এমনকি জীবন-হুমকির কারণ হতে পারে।
পাইলোনেফ্রাইটিস হলো কিডনির পেলভিস (pelvis) এবং কিডনির টিস্যুর (parenchyma) একটি প্রদাহ। এটি সাধারণত ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের কারণে হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, সংক্রমণ শুরু হয় নিম্ন মূত্রনালীতে (মূত্রনালী এবং মূত্রাশয়) এবং সেখান থেকে ইউরেটার (ureters) হয়ে কিডনিতে ছড়িয়ে পড়ে।
(১) আরোহী সংক্রমণ (Ascending Infection):
এটি সবচেয়ে সাধারণ পথ। সাধারণত, মলদ্বারের কাছাকাছি থাকা ব্যাকটেরিয়া
(যেমন Escherichia coli - E. coli) মূত্রনালীতে প্রবেশ করে। মহিলাদের ক্ষেত্রে এটি বেশি দেখা যায়
কারণ তাদের মূত্রনালী পুরুষের চেয়ে ছোট এবং মলদ্বারের কাছাকাছি।
(ক) ব্যাকটেরিয়া মূত্রনালী দিয়ে
মূত্রাশয়ে প্রবেশ করে এবং সেখানে বৃদ্ধি পায়, যার ফলে মূত্রাশয় সংক্রমণ (সিস্টাইটিস) হয়।
(খ) যদি সিস্টাইটিসের চিকিৎসা না করা হয় বা এটি খুব আক্রমণাত্মক হয়, তাহলে ব্যাকটেরিয়া
ইউরেটার দিয়ে উপরের দিকে উঠে কিডনিতে প্রবেশ করতে পারে, যার ফলে পাইলোনেফ্রাইটিস হয়।
(২) রক্তবাহিত সংক্রমণ (Hematogenous Spread): এটি বিরল। শরীরের অন্য
কোনো স্থানের সংক্রমণ (যেমন ত্বকের সংক্রমণ) থেকে ব্যাকটেরিয়া রক্তপ্রবাহের মাধ্যমে কিডনিতে পৌঁছাতে পারে।
কিডনি সংক্রমণের লক্ষণগুলো হঠাৎ করে দেখা দিতে পারে এবং এর তীব্রতা হালকা থেকে গুরুতর হতে পারে:
(১) ব্যথা:
(ক) পিঠের উপরের অংশে বা পাঁজরের নিচে ব্যথা:সাধারণত
একপাশে (যে কিডনি আক্রান্ত) তীব্র, ধারাবাহিক বা কাঁপুনিযুক্ত ব্যথা হয়। এটি ফ্ল্যাঙ্ক পেইন (Flank pain) নামে পরিচিত।
(খ) তলপেটে বা কুঁচকিতেও ব্যথা হতে পারে।
(২) জ্বর এবং ঠাণ্ডা লাগা:
(ক) উচ্চ জ্বর (সাধারণত ১০২°F বা ৩৯°C এর উপরে) খুবই সাধারণ।
(খ) কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসা (chills)।
(৩) সাধারণ অসুস্থতার অনুভূতি:
(ক) ক্লান্তি এবং দুর্বলতা।
(খ) বমি বমি ভাব এবং বমি।
(গ) ক্ষুধামন্দা।
(৪) মূত্রত্যাগের সমস্যা (নিম্ন মূত্রনালীর সংক্রমণের লক্ষণ):
(ক) প্রস্রাবের সময় জ্বালাপোড়া বা ব্যথা (dysuria)।
(খ) ঘন ঘন প্রস্রাব করার তাগিদ (frequency)।
(গ) প্রস্রাব করার জরুরি প্রয়োজন অনুভব করা (urgency)।
(ঘ) মেঘলা, দুর্গন্ধযুক্ত বা রক্তযুক্ত প্রস্রাব।
(৫) ঝুঁকির কারণ (Risk Factors):
কিছু কারণ কিডনি সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়:
(ক) লিঙ্গ: মহিলাদের কিডনি সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি কারণ তাদের মূত্রনালী পুরুষের চেয়ে ছোট
এবং মলদ্বারের কাছাকাছি।
(খ) গর্ভধারণ: গর্ভাবস্থায় হরমোনের পরিবর্তন এবং ইউরেটারের
উপর জরায়ুর চাপ প্রস্রাবের প্রবাহকে প্রভাবিত করতে পারে।
(গ) মূত্রনালীর গঠনগত অস্বাভাবিকতা:
মূত্রনালীর জন্মগত ত্রুটি বা অস্বাভাবিকতা যা প্রস্রাবের স্বাভাবিক প্রবাহকে বাধা দেয়।
(ঘ) মূত্রনালীর বাধা:
কিডনিতে পাথর, প্রোস্টেট গ্রন্থির বৃদ্ধি (পুরুষদের ক্ষেত্রে), বা টিউমার মূত্রনালীতে বাধা সৃষ্টি করতে পারে এবং প্রস্রাব
আটকে রাখতে পারে, যা ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধির জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে।
(ঙ) দুর্বল প্রতিরোধ ব্যবস্থা:
ডায়াবেটিস, এইচআইভি/এইডস, বা কেমোথেরাপি গ্রহণকারী ব্যক্তিদের দুর্বল প্রতিরোধ ব্যবস্থার কারণে সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি।
(চ) ভেসিইউরেটেরাল রিফ্লাক্স (Vesicoureteral Reflux - VUR): এমন একটি অবস্থা যেখানে
প্রস্রাব মূত্রাশয় থেকে ইউরেটার এবং কিডনিতে ফিরে আসে। এটি বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে সাধারণ।
(ছ) মূত্রনালীর ক্যাথেটার ব্যবহার: দীর্ঘ সময় ধরে ক্যাথেটার ব্যবহার করলে ব্যাকটেরিয়ার প্রবেশের পথ তৈরি হয়।
(ছ) যৌন কার্যকলাপ: যৌন মিলনের সময় ব্যাকটেরিয়া মূত্রনালীতে প্রবেশ করতে পারে।
(জ) বারবার মূত্রনালীর সংক্রমণ (UTIs): যাদের বারবার মূত্রাশয় সংক্রমণ হয়, তাদের কিডনি সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি।
৪। রোগ নির্ণয়:
(ক) শারীরিক পরীক্ষা: চিকিৎসক লক্ষণ এবং শারীরিক পরীক্ষা করবেন।
(খ) মূত্র পরীক্ষা (Urinalysis): প্রস্রাবে শ্বেত রক্তকণিকা (WBCs), লোহিত রক্তকণিকা (RBCs) এবং
ব্যাকটেরিয়া আছে কিনা তা দেখা হয়।
(গ) মূত্র সংস্কৃতি (Urine Culture): প্রস্রাবে কোন ধরণের ব্যাকটেরিয়া
আছে এবং কোন অ্যান্টিবায়োটিক তাদের প্রতি সংবেদনশীল তা সনাক্ত করতে সাহায্য করে।
(ঘ) রক্ত পরীক্ষা:
রক্তের শ্বেত রক্তকণিকার সংখ্যা, কিডনির কার্যকারিতা (ক্রিয়েটিনিন এবং BUN) এবং সংক্রমণের উপস্থিতি (CRP, ESR) দেখতে করা হয়।
(ঙ) ইমেজিং পরীক্ষা: যদি সংক্রমণ জটিল হয় বা বারবার হয়, তবে কিডনিতে কোনো অস্বাভাবিকতা,
পাথর বা বাধা আছে কিনা তা দেখতে আল্ট্রাসাউন্ড, সিটি স্ক্যান বা এমআরআই করা যেতে পারে।
৫। চিকিৎসা:
কিডনি সংক্রমণের চিকিৎসার জন্য সাধারণত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়। চিকিৎসার পদ্ধতি নির্ভর করে সংক্রমণের তীব্রতা, রোগীর সামগ্রিক স্বাস্থ্য এবং ব্যাকটেরিয়ার ধরণের উপর।
(১) অ্যান্টিবায়োটিক:
(ক) প্রাথমিকভাবে, ব্রড-স্পেকট্রাম অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়।
(খ) মূত্র সংস্কৃতির ফলাফলের উপর ভিত্তি করে, অ্যান্টিবায়োটিক পরিবর্তন করা হতে পারে যাতে এটি নির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কার্যকর হয়।
(গ) হালকা থেকে মাঝারি সংক্রমণের জন্য বাড়িতে মৌখিক অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়। সাধারণত ৭ থেকে ১৪ দিনের একটি কোর্স সম্পূর্ণ করতে হয়।
(ঘ) গুরুতর সংক্রমণের জন্য, হাসপাতালে ভর্তি করে শিরায় (intravenous - IV) অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়।
অবস্থা স্থিতিশীল হলে মৌখিক অ্যান্টিবায়োটিকে স্থানান্তরিত করা হয়।
(২) ব্যথা ও জ্বর কমানো: প্যারাসিটামল বা আইবুপ্রোফেনের মতো ব্যথানাশক
এবং জ্বর কমানোর ওষুধ ব্যবহার করা যেতে পারে।
(৩) জল পান: প্রচুর পরিমাণে জল পান করলে মূত্রাশয় থেকে ব্যাকটেরিয়া বের
করে দিতে সাহায্য করে।
(৪) হাসপাতালে ভর্তি (গুরুতর ক্ষেত্রে): যদি রোগী তীব্র অসুস্থ থাকেন, ডিহাইড্রেশন হয়,
মৌখিক ওষুধ সহ্য করতে না পারেন, গর্ভবতী হন বা দুর্বল প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকে, তবে হাসপাতালে ভর্তি করা প্রয়োজন হতে পারে।
৬। জটিলতা:
চিকিৎসা না করা হলে বা দেরিতে চিকিৎসা করা হলে কিডনি সংক্রমণের গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে:
(ক) কিডনিতে ক্ষত (Kidney Scarring): বারবার বা গুরুতর সংক্রমণের কারণে কিডনির
টিস্যুতে স্থায়ী ক্ষত তৈরি হতে পারে, যা কিডনির কার্যকারিতা হ্রাস করে।
(খ) দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ (Chronic Kidney Disease - CKD): কিডনিতে বারবার ক্ষত তৈরি হলে দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের ঝুঁকি বাড়ে,
যা কিডনি ব্যর্থতার দিকে নিয়ে যেতে পারে।
(গ) সেপসিস (Sepsis): সংক্রমণ রক্তপ্রবাহে ছড়িয়ে পড়লে সেপসিস হতে পারে, যা একটি জীবন-হুমকিপূর্ণ অবস্থা।
(ঘ) কিডনিতে ফোড়া (Kidney Abscess): কিডনির মধ্যে পুঁজ জমা হয়ে ফোড়া তৈরি হতে পারে।
(ঙ) এম্পাইসেমাটাস পাইলোনেফ্রাইটিস (Emphysematous Pyelonephritis): এটি একটি বিরল এবং গুরুতর সংক্রমণ
যেখানে কিডনির টিস্যুতে গ্যাস তৈরি হয়, সাধারণত ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে দেখা যায়।
৭। প্রতিরোধ:
কিডনি সংক্রমণ প্রতিরোধে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো সহায়ক হতে পারে:
(ক) প্রচুর জল পান: পর্যাপ্ত জল পান করলে প্রস্রাব ঘন হয় না এবং মূত্রাশয় থেকে ব্যাকটেরিয়া ধুয়ে বেরিয়ে যায়।
(খ) সঠিক ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা: বিশেষ করে মহিলাদের জন্য, মলত্যাগের পর সামনে থেকে পিছনে পরিষ্কার করা উচিত।
(গ) প্রস্রাব ধরে না রাখা: যখনই প্রস্রাবের প্রয়োজন হয়, তখনই মূত্রাশয় খালি করা উচিত।
(ঘ) যৌন মিলনের পর প্রস্রাব: যৌন মিলনের পর প্রস্রাব করলে মূত্রনালীতে প্রবেশ করা ব্যাকটেরিয়া ধুয়ে বেরিয়ে যেতে পারে।
(ঙ) মূত্রনালীর অস্বাভাবিকতার চিকিৎসা: যদি কোনো গঠনগত সমস্যা থাকে, তার চিকিৎসা করানো।
(চ) ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ: ডায়াবেটিস রোগীদের রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা উচিত। কিডনি সংক্রমণ একটি গুরুতর অবস্থা
এবং এর লক্ষণ দেখা গেলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অপরিহার্য। সময়মতো সঠিক চিকিৎসা কিডনির স্থায়ী ক্ষতি রোধ করতে পারে।