আইবিএস (IBS) এবং আইবিডি (IBD) উভয়ই পরিপাকতন্ত্রের দীর্ঘস্থায়ী রোগ, যার লক্ষণগুলো প্রায় একই রকম হওয়ায় অনেক সময় এদেরকে এক বলে ভুল করা হয়। তবে এদের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। আইবিএস এবং আইবিডি-এর মূল পার্থক্য হলো:
(ক) আইবিএস (IBS) বা Irritable Bowel Syndrome হলো একটি কার্যগত ব্যাধি (Functional Disorder): এর অর্থ হলো, এই রোগে পরিপাকতন্ত্রের কার্যকারিতা ব্যাহত হয়, কিন্তু এর অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত কোনো ক্ষতি বা প্রদাহ হয় না। অর্থাৎ, এন্ডোস্কোপি, বায়োপসি বা অন্যান্য পরীক্ষা করলে অন্ত্রের মধ্যে কোনো ক্ষত, ফোলা বা প্রদাহ দেখা যায় না। এটি মূলত অন্ত্রের পেশীগুলির অস্বাভাবিক সংকোচন এবং মস্তিষ্কের সাথে অন্ত্রের যোগাযোগের সমস্যার কারণে ঘটে।
(খ) আইবিডি (IBD) বা Inflammatory Bowel Disease হলো একটি প্রদাহজনিত রোগ (Inflammatory Disease):এই রোগে পরিপাকতন্ত্রের মধ্যে স্থায়ী এবং মারাত্মক প্রদাহ (inflammation) হয়, যা অন্ত্রের টিস্যুর ক্ষতি এবং আলসার সৃষ্টি করতে পারে। এটি একটি অটোইমিউন রোগ, যেখানে শরীরের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুলবশত অন্ত্রের কোষগুলোকে আক্রমণ করে।
(ক) আইবিএস (IBS) এর কোনো উপ-প্রকার নেই, তবে লক্ষণ অনুযায়ী এর বিভিন্ন ধরন চিহ্নিত করা হয়। যেমন:
(১) IBS-C: যেখানে কোষ্ঠকাঠিন্য প্রধান লক্ষণ।
(২) IBS-D: যেখানে ডায়রিয়া প্রধান লক্ষণ।
(৩) IBS-M: যেখানে কোষ্ঠকাঠিন্য ও ডায়রিয়া উভয়ই পর্যায়ক্রমে ঘটে।
(খ) আইবিডি (IBD) এর প্রধান দুটি ধরন রয়েছে:
(১) ক্রোনস ডিজিজ (Crohn's Disease): এই রোগে মুখ থেকে পায়ুপথ পর্যন্ত পরিপাকতন্ত্রের যেকোনো অংশ আক্রান্ত হতে পারে। প্রদাহ অন্ত্রের বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়ে এবং স্বাস্থ্যকর এলাকার মাঝে মাঝে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ থাকতে পারে।
(২) আলসারেটিভ কোলাইটিস (Ulcerative Colitis): এই রোগ শুধু বৃহদন্ত্র (large intestine) এবং মলদ্বারে (rectum) সীমাবদ্ধ থাকে। প্রদাহটি শুধুমাত্র অন্ত্রের ভিতরের স্তরে হয় এবং সাধারণত একটি নির্দিষ্ট অংশ থেকে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে।
(ক) আইবিএস (IBS) এর লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে পেটে ব্যথা, গ্যাস, ফোলাভাব, ডায়রিয়া বা কোষ্ঠকাঠিন্য। এই রোগ জীবনের মানকে প্রভাবিত করতে পারে, তবে এটি অন্ত্রের স্থায়ী ক্ষতি করে না বা জীবন-হুমকির কারণ হয় না।
(খ) আইবিডি (IBD) এর লক্ষণগুলো আইবিএস-এর মতো হতে পারে, তবে তা আরও গুরুতর। যেমন: পেটে তীব্র ব্যথা, ঘন ঘন ডায়রিয়া (প্রায়শই রক্ত বা শ্লেষ্মা সহ), জ্বর, ক্লান্তি, ওজন হ্রাস এবং পুষ্টির ঘাটতি। সঠিক চিকিৎসা না হলে আইবিডি-এর ফলে অন্ত্র সরু হয়ে যাওয়া, ছিদ্র হওয়া, পুষ্টির শোষণ ব্যাহত হওয়া, এমনকি অন্ত্রের ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকিও থাকে।
(ক) আইবিএস (IBS) নির্ণয়ের জন্য সাধারণত কোনো নির্দিষ্ট পরীক্ষা নেই। ডাক্তার রোগীর লক্ষণ, চিকিৎসার ইতিহাস এবং অন্যান্য গুরুতর রোগ (যেমন আইবিডি) বাতিল করার জন্য কিছু পরীক্ষা করেন। এর চিকিৎসা প্রধানত জীবনযাত্রার পরিবর্তন, খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণ, মানসিক চাপ ব্যবস্থাপনা এবং লক্ষণ উপশমের জন্য ওষুধ ব্যবহারের উপর নির্ভর করে।
(খ) আইবিডি (IBD) নির্ণয় করতে এন্ডোস্কোপি, কোলনোস্কোপি, বায়োপসি, রক্ত পরীক্ষা এবং ইমেজিং পরীক্ষা (যেমন সিটি স্ক্যান
বা এমআরআই) করা হয়, যা অন্ত্রের প্রদাহ ও ক্ষয়-ক্ষতি স্পষ্টভাবে দেখায়। এর চিকিৎসার জন্য প্রদাহ কমানোর ওষুধ,
ইমিউনোসাপ্রেস্যান্ট (রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দমনকারী) ওষুধ এবং কিছু ক্ষেত্রে সার্জারির প্রয়োজন হয়।
সংক্ষেপে,
আইবিএস হলো একটি কার্যগত ব্যাধি যা অন্ত্রের কার্যকারিতাকে প্রভাবিত করে, কিন্তু কোনো শারীরিক ক্ষতি করে না।
অন্যদিকে, আইবিডি হলো একটি গুরুতর প্রদাহজনিত রোগ যা অন্ত্রের স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে। তাই, পেটের যেকোনো
দীর্ঘস্থায়ী সমস্যায় সঠিক রোগ নির্ণয় এবং সঠিক চিকিৎসার জন্য একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।