দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস্ট্রাইটিস (Chronic Gastritis) হলো পাকস্থলীর ভেতরের আবরণের (মিউকোসা) দীর্ঘমেয়াদী প্রদাহ। তীব্র গ্যাস্ট্রাইটিসের মতো এটি হঠাৎ করে শুরু হয় না, বরং ধীরে ধীরে বিকাশ লাভ করে এবং দীর্ঘ সময় ধরে স্থায়ী হয়। এটি পাকস্থলীর আবরণে গঠনগত পরিবর্তন ঘটাতে পারে, যেমন গ্রন্থিগুলোর ক্ষয় (অ্যাট্রোফি) বা কোষের ধরন পরিবর্তন (মেটাপ্লাসিয়া), যা কিছু ক্ষেত্রে ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
পাকস্থলীর ভেতরের আস্তরণে এক ধরনের শ্লেষ্মা স্তর থাকে যা অ্যাসিড এবং হজমকারী এনজাইম থেকে পাকস্থলীকে রক্ষা করে। যখন এই প্রতিরক্ষামূলক স্তরটি দুর্বল হয়ে যায় এবং দীর্ঘকাল ধরে প্রদাহ চলতে থাকে, তখন গ্যাস্ট্রাইটিস দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেয়। এই দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ ধীরে ধীরে পাকস্থলীর গ্রন্থিগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং এর স্বাভাবিক কার্যকারিতা ব্যাহত করে।
দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস্ট্রাইটিসের প্রধান কারণগুলো হলো:
এটি দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস্ট্রাইটিসের সবচেয়ে সাধারণ কারণ। এই ব্যাকটেরিয়া বিশ্বব্যাপী অনেক মানুষের পাকস্থলীতে বসবাস করে এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রদাহ সৃষ্টি করে। H. pylori সংক্রমণ সময়মতো চিকিৎসা না করলে পাকস্থলীর আবরণে স্থায়ী পরিবর্তন আনতে পারে, যা পেপটিক আলসার এবং কিছু ক্ষেত্রে গ্যাস্ট্রিক ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। ব্যাকটেরিয়াটি সরাসরি পাকস্থলীর আবরণের কোষগুলোকে ক্ষতিগ্রস্থ করে এবং প্রদাহ সৃষ্টি করে।
এটি একটি রোগ যেখানে শরীরের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুলবশত পাকস্থলীর স্বাস্থ্যকর কোষগুলোকে (বিশেষ করে প্যারাইটাল কোষ, যা অ্যাসিড এবং ইন্ট্রিনসিক ফ্যাক্টর তৈরি করে) আক্রমণ করে ধ্বংস করে দেয়। ইন্ট্রিনসিক ফ্যাক্টর ভিটামিন বি১২ শোষণের জন্য অপরিহার্য। তাই এই ধরনের গ্যাস্ট্রাইটিস প্রায়শই পারনিসিয়াস অ্যানিমিয়া (Pernicious Anemia) নামক রক্তস্বল্পতার কারণ হয়, কারণ ভিটামিন বি১২ এর অভাবে লোহিত রক্তকণিকা উৎপাদন ব্যাহত হয়। এই ধরনের গ্যাস্ট্রাইটিসে পাকস্থলীর অ্যাট্রোফিও হতে পারে।
অতিরিক্ত পরিমাণে এবং দীর্ঘ সময় ধরে অ্যালকোহল সেবন করলে পাকস্থলীর আবরণে ক্রমাগত জ্বালাপোড়া ও প্রদাহ হয়, যা দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস্ট্রাইটিসে রূপ নিতে পারে।
কোনো কারণে যদি পিত্তথলি থেকে পিত্তরস ক্ষুদ্রান্ত্রে না গিয়ে উল্টো দিকে পাকস্থলীতে ফিরে আসে, তবে পিত্তরসের ক্ষয়কারী প্রভাবের কারণে পাকস্থলীর আবরণে প্রদাহ হতে পারে। এটি সাধারণত গ্যাস্ট্রিক সার্জারির পর বা পিত্তথলির কিছু সমস্যার কারণে ঘটে।
অ্যাসপিরিন, আইবুপ্রোফেন বা নেপ্রোক্সেনের মতো ব্যথানাশক ঔষধের দীর্ঘমেয়াদী বা নিয়মিত ব্যবহার পাকস্থলীর প্রতিরক্ষামূলক শ্লেষ্মা স্তরকে দুর্বল করে দেয় এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে।
(ক) ক্রোনস ডিজিজ (Crohn's Disease): এটি একটি প্রদাহজনক আন্ত্রিক রোগ যা
পরিপাকতন্ত্রের যেকোনো অংশে প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে, যার মধ্যে পাকস্থলীও অন্তর্ভুক্ত।
(খ) সারকয়ডোসিস (Sarcoidosis): এটি এমন একটি রোগ যেখানে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে (পাকস্থলী সহ) প্রদাহজনক কোষের সমষ্টি (গ্রানুলোমা) তৈরি হয়।
(গ) কিডনি ফেইলিউর: কিডনি ফেইলিউরের কারণে রক্তে ইউরিয়া এবং অন্যান্য বর্জ্য পদার্থ জমা হতে পারে, যা পাকস্থলীর আবরণে জ্বালাপোড়া সৃষ্টি করে।
যক্ষ্মা, সিফিলিস বা কিছু ছত্রাক সংক্রমণও বিরল ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস্ট্রাইটিসের কারণ হতে পারে।
দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস্ট্রাইটিসের লক্ষণগুলো প্রায়শই হালকা বা অস্পষ্ট হয় এবং ধীরে ধীরে প্রকাশ পায়। কিছু ক্ষেত্রে কোনো লক্ষণ নাও থাকতে পারে। সাধারণ লক্ষণগুলো হলো:
(১) উপরের পেটে হালকা ব্যথা বা অস্বস্তি: ব্যথা সাধারণত তীব্র হয় না, বরং এটি একটি চাপা বা অস্বস্তিকর অনুভূতি হতে পারে।
বিশেষ করে খাওয়ার পর পেট ফাঁপা অনুভূত হতে পারে।
(৩) বমি বমি ভাব: এটি মাঝে মাঝে হতে পারে, তবে তীব্র হয় না।
(৪) ক্ষুধা মন্দা: খাওয়ার প্রতি অনীহা বা অল্প খেলেও পেট ভরে যাওয়ার অনুভূতি।
(৫) বদহজম (Indigestion): হজমে অসুবিধা, গ্যাস বা অস্বস্তি।
(৬) পুষ্টি উপাদানের অভাব: বিশেষ করে অটোইমিউন গ্যাস্ট্রাইটিসের ক্ষেত্রে ভিটামিন বি ১২ এর অভাবের কারণে ক্লান্তি, দুর্বলতা,
ফ্যাকাশে ত্বক এবং স্নায়বিক সমস্যা (যেমন হাত-পায়ে ঝিনঝিন করা বা অসাড়তা) দেখা দিতে পারে।
(৭) কালো মল (Melena): যদি দীর্ঘমেয়াদী প্রদাহের কারণে অল্প রক্তপাত হয়, তবে মল কালো হতে পারে।
দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস্ট্রাইটিস নির্ণয়ের জন্য ডাক্তার নিম্নলিখিত পরীক্ষাগুলো করাতে পারেন:
(১) শারীরিক পরীক্ষা ও লক্ষণ পর্যালোচনা: রোগীর বর্তমান এবং অতীতের লক্ষণ, ঔষধের ব্যবহার এবং পারিবারিক ইতিহাস
সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাওয়া হয়।
(২) H. pylori পরীক্ষা: রক্ত পরীক্ষা (অ্যান্টিবডির জন্য), ইউরিয়া ব্রেথ টেস্ট (শ্বাস পরীক্ষা), বা মল
পরীক্ষার মাধ্যমে H. pylori ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়।
(৩) এন্ডোস্কোপি ও বায়োপসি: এটি দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস্ট্রাইটিস নির্ণয়ের সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি। একটি পাতলা, নমনীয় টিউব (এন্ডোস্কোপ)
মুখের মাধ্যমে পাকস্থলী পর্যন্ত প্রবেশ করানো হয়। এর সাহায্যে পাকস্থলীর আবরণ সরাসরি দেখা যায় এবং প্রদাহের ধরন ও মাত্রা পর্যবেক্ষণ করা হয়। প্রয়োজনে
টিস্যুর ছোট নমুনা (বায়োপসি) সংগ্রহ করে মাইক্রোস্কোপের নিচে পরীক্ষা করা হয়, যা প্রদাহের কারণ, অ্যাট্রোফি বা মেটাপ্লাসিয়ার মতো
পরিবর্তনগুলো নিশ্চিত করতে সাহায্য করে।
(৪) রক্ত পরীক্ষা: রক্তস্বল্পতা (বিশেষ করে ভিটামিন বি১২ এর অভাবজনিত রক্তস্বল্পতা) বা অন্যান্য অন্তর্নিহিত অবস্থার জন্য করা হয়।
দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস্ট্রাইটিসের চিকিৎসা মূলত এর অন্তর্নিহিত কারণের ওপর নির্ভর করে:
যদি H. pylori সংক্রমণ থাকে, তবে ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কাজ করার জন্য অ্যান্টিবায়োটিকের একটি কোর্স (সাধারণত দুটি বা তিনটি অ্যান্টিবায়োটিকের মিশ্রণ) দেওয়া হয়, সাথে অ্যাসিড কমানোর ঔষধ (যেমন PPIs) যোগ করা হয়। একে ট্রিপল থেরাপি বা কোয়াড্রপল থেরাপি বলা হয়।
(ক) প্রোটন পাম্প ইনহিবিটরস (PPIs): যেমন ওমিপ্রাজল, প্যান্টোপ্রাজল। এই ঔষধগুলো পাকস্থলীর
অ্যাসিড উৎপাদন কার্যকরভাবে কমিয়ে দেয়, যা পাকস্থলীর আবরণকে সুস্থ হতে সাহায্য করে।
(খ) H2 ব্লকার: যেমন রেনিটিডিন (যদিও এর ব্যবহার এখন সীমিত), ফ্যামোটিডিন। এগুলোও অ্যাসিড উৎপাদন কমায়।
(ক) অ্যালকোহল ও NSAIDs এড়িয়ে চলা: যদি এগুলো কারণ হয়।
(খ) খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন: ঝাল, মশলাদার, চর্বিযুক্ত এবং অতিরিক্ত অ্যাসিডিক খাবার পরিহার করা। ছোট ছোট খাবার বারে বারে খাওয়া।
(গ) ধূমপান ত্যাগ করা: ধূমপান পাকস্থলীর আবরণের ক্ষতি করে।
(ঘ) মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ: যোগা, মেডিটেশন বা অন্যান্য কৌশল ব্যবহার করে মানসিক চাপ কমানো।
অটোইমিউন গ্যাস্ট্রাইটিস বা গুরুতর অ্যাট্রোফিক গ্যাস্ট্রাইটিসের ক্ষেত্রে ভিটামিন বি ১২ এর অভাব হতে পারে। সেক্ষেত্রে ভিটামিন বি ১২ ইনজেকশন বা সাপ্লিমেন্ট প্রয়োজন হতে পারে।
দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস্ট্রাইটিসের কিছু প্রকার, বিশেষ করে অ্যাট্রোফিক গ্যাস্ট্রাইটিস বা মেটাপ্লাসিয়া থাকলে, গ্যাস্ট্রিক ক্যান্সারের ঝুঁকির জন্য নিয়মিত এন্ডোস্কোপিক ফলোআপের প্রয়োজন হতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস্ট্রাইটিস একটি জটিল অবস্থা হতে পারে যা দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলে। সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় এবং উপযুক্ত চিকিৎসা গ্রহণ করা জটিলতা এড়ানোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।