গ্যাস্ট্রাইটিস, বা পাকস্থলীর আবরণের প্রদাহ, মানব ইতিহাসের শুরু থেকেই একটি পরিচিত স্বাস্থ্য সমস্যা। যদিও প্রাচীনকালে এর সুনির্দিষ্ট কারণ বা প্যাথলজি সম্পর্কে বর্তমানের মতো জ্ঞান ছিল না, তবে মানুষ পেটের ব্যথা, বদহজম এবং বমি বমি ভাবের মতো লক্ষণগুলোকে বিভিন্ন উপায়ে ব্যাখ্যা ও চিকিৎসার চেষ্টা করত। গ্যাস্ট্রাইটিস রোগের ইতিহাস চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিবর্তনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
প্রাচীন সভ্যতায় পাকস্থলীর সমস্যাগুলোকে প্রায়শই "বদহজম" বা "পেটের দুর্বলতা" হিসেবে দেখা হতো। সে সময় রোগের কারণ হিসেবে অভ্যন্তরীণ ভারসাম্যহীনতা, খাদ্যাভ্যাস বা দৈবশক্তির প্রভাবকে দায়ী করা হতো।
(ক) প্রাচীন গ্রীক ও রোমান সভ্যতা: ড. হিপোক্রেটিস এবং ডা. গ্যালেনের মতো প্রখ্যাত চিকিৎসকরা মানবদেহের চারটি রস (humors) - রক্ত, কফ, পিত্তরস এবং কালো পিত্তরস - এর ভারসাম্যহীনতাকে রোগের কারণ হিসেবে দেখতেন। গ্যাস্ট্রাইটিসের মতো পেটের সমস্যাকে প্রায়শই পিত্তরসের আধিক্য বা "তাপ" এর সাথে সম্পর্কিত বলে মনে করা হতো। এর চিকিৎসায় খাদ্য নিয়ন্ত্রণ, বমি করানো বা বিরেচক ঔষধের ব্যবহার প্রচলিত ছিল।
(খ) মধ্যযুগ ও ইসলামী স্বর্ণযুগ: এই সময়ে আরব চিকিৎসকরা গ্রীক ও রোমান জ্ঞানকে আরও প্রসারিত করেন। আভিসেনা তার "ক্যানন অফ মেডিসিন" গ্রন্থে হজমের সমস্যা এবং পাকস্থলীর প্রদাহের লক্ষণগুলো বর্ণনা করেন। তারা ভেষজ ঔষধ, খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন এবং জীবনযাত্রার নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দিতেন। এ সময় পাকস্থলীর জ্বালাপোড়া বা প্রদাহকে ঠান্ডা বা গরম প্রকৃতির খাবারের প্রভাব হিসেবে দেখা হতো।
গ্যাস্ট্রাইটিসকে একটি স্বতন্ত্র রোগ হিসেবে চিহ্নিত করা এবং এর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি উন্মোচন করা শুরু হয় ১৮শ শতক থেকে।
(ক) জার্মান চিকিৎসক জর্জ আর্নস্ট স্টাহল (Georg Ernst Stahl) ১৭২৮ সালে
প্রথম "গ্যাস্ট্রাইটিস" (Gastritis) শব্দটি ব্যবহার করেন পাকস্থলীর অভ্যন্তরীণ আবরণের প্রদাহ বর্ণনা করার জন্য।
(খ) এই ধারণাকে একটি পৃথক রোগ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন ফরাসি সামরিক চিকিৎসক ফ্রাঁসোয়া ব্রুসো (François
Broussais)। ১৮০৮ সালে তার বই "History of Chronic Phlegmasias or Inflammations" এ তিনি মৃত
সৈন্যদের পাকস্থলীর প্রদাহের বর্ণনা দেন এবং এটিকে "গ্যাস্ট্রাইটিস" নামে অভিহিত করেন। যদিও পরবর্তীতে স্কটিশ
প্যাথলজিস্ট কার্সওয়েল (Carswell) ১৮৩৮ সালে দেখান যে ব্রুসোর বর্ণিত অনেক পরিবর্তনই মৃত্যুর পরের
(postmortem) পরিবর্তনের ফল ছিল।
(ক) ১৮৫০-এর দশকে চার্লস এইচ. জোনস (Charles H. Jones) এবং
এডওয়ার্ড এইচ. সিভেকিং (Edward H. Sieveking) (১৮৫৪) এবং উইলসন ফক্স (Wilson Fox) (১৮৫৮)
প্রথম পাকস্থলীর আবরণের প্রদাহের আণুবীক্ষণিক (microscopic) বর্ণনা দেন। তারা প্রদাহের বিস্তৃত (diffuse)
এবং খণ্ডিত (segmental) রূপের মধ্যে পার্থক্য করেন।
(খ) ১৮৫৯ সালে ব্রিটিশ চিকিৎসক উইলিয়াম ব্রিনটন (William Brinton) তার "Diseases of Stomach"
বইয়ে গ্যাস্ট্রাইটিসকে তীব্র, সাবঅ্যাকিউট এবং দীর্ঘস্থায়ী রূপে ভাগ করেন এবং তাদের হিস্টোলজিক্যাল
(কলাস্থানিক) পার্থক্য ও ক্লিনিকাল লক্ষণগুলোর তুলনা করেন।
(গ) ১৮৭০ সালে স্যামুয়েল ফেনউইক (Samuel Fenwick) গ্যাস্ট্রিক অ্যাট্রোফির (পাকস্থলীর গ্রন্থির ক্ষয়) বর্ণনা দেন।
(ঘ) ১৮৬৮ সালে জার্মান থেরাপিস্ট কুসমল (Kussmaul) গ্যাস্ট্রিক টিউবের ব্যবহার প্রস্তাব করেন, যা পাকস্থলীর
কার্যকারিতা, যেমন গতিশীলতা এবং গ্রন্থিগুলির ক্ষরণ ক্ষমতা অধ্যয়নের একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।
(ক) এন্ডোস্কোপির আবিষ্কার: ১৯৩২ সালে স্কিন্ডলার (Schindler) আধা-অনমনীয় গ্যাস্ট্রস্কোপ আবিষ্কার করেন, যা জীবদ্দশায় (in vivo) গ্যাস্ট্রাইটিস নির্ণয় করা সম্ভব করে তোলে। তিনি তার ১৯৪৬ সালের মনোগ্রাফ "Gastritis"-এ গ্যাস্ট্রাইটিসকে তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করেন, এবং দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস্ট্রাইটিসকে সুপারফিশিয়াল, অ্যাট্রোফিক ও হাইপারট্রফিক উপভাগে ভাগ করেন। ১৯৫৬ সালে লুইস স্ট্রেইফেনডার (Louis Streifeneder) এবং এডি পালমার (Eddy Palmer) ফাইবার অপটিক এন্ডোস্কোপ প্রবর্তন করেন, যা গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল রোগ নির্ণয়ে বিপ্লব নিয়ে আসে।
(খ) H. pylori ব্যাকটেরিয়ার আবিষ্কার: গ্যাস্ট্রাইটিসের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে ১৯৮২ সালে, যখন অস্ট্রেলিয়ান বিজ্ঞানী রবিন ওয়ারেন (Robin Warren) এবং ব্যারি মার্শাল (Barry Marshall) পাকস্থলীতে হেলিকোব্যাক্টার পাইলোরি (Helicobacter pylori) ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি আবিষ্কার করেন। তারা প্রমাণ করেন যে এই ব্যাকটেরিয়া দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস্ট্রাইটিস এবং পেপটিক আলসারের একটি প্রধান কারণ। এই আবিষ্কার গ্যাস্ট্রাইটিসের চিকিৎসা এবং রোগ নির্ণয়ের পদ্ধতিকে সম্পূর্ণভাবে পরিবর্তন করে দেয় এবং এর জন্য ২০০৫ সালে তাদের নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়।
(গ) শ্রেণিবিভাগের আধুনিকীকরণ: ১৯৯৪ সালে হিউস্টনে অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্কশপে গ্যাস্ট্রাইটিসের শ্রেণিবিন্যাস এবং গ্রেডিংয়ের জন্য আপডেটেড সিডনি সিস্টেম (Updated Sydney System) চালু হয়, যা হিস্টোপ্যাথলজিক্যাল বৈশিষ্ট্যের ওপর জোর দেয়। ২০০৫ সালে OLGA (Operative Link on Gastritis Assessment) স্টেজিং সিস্টেম গ্যাস্ট্রিক হিস্টোলজি রিপোর্টিংয়ের জন্য প্রবর্তিত হয়।
(ক) বর্তমানে গ্যাস্ট্রাইটিসের চিকিৎসায় প্রোটন পাম্প ইনহিবিটরস (PPIs), H2 ব্লকার, এবং H. pylori সংক্রমণের জন্য
অ্যান্টিবায়োটিক থেরাপি ব্যবহার করা হয়।
(খ) অটোইমিউন গ্যাস্ট্রাইটিস এবং অন্যান্য বিশেষ ধরনের গ্যাস্ট্রাইটিস সম্পর্কে আরও গভীর গবেষণা হয়েছে, যার ফলে
ভিটামিন বি১২ এর অভাবজনিত পারনিসিয়াস অ্যানিমিয়ার মতো জটিলতাগুলোর কার্যকর চিকিৎসা সম্ভব হয়েছে।
(গ) জীবনযাত্রার পরিবর্তন, খাদ্যাভ্যাস এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের ওপরও জোর দেওয়া হয়। গ্যাস্ট্রাইটিস রোগের ইতিহাস
মানুষের পাকস্থলীর সমস্যা বোঝার এবং তার চিকিৎসায় নিরন্তর প্রচেষ্টার একটি প্রতিচ্ছবি। প্রাচীনকালের সাধারণ পর্যবেক্ষণ থেকে
শুরু করে আধুনিক আণুবীক্ষণিক এবং আণবিক স্তরের জ্ঞান পর্যন্ত, এই রোগের ধারণা ও চিকিৎসা ব্যবস্থা একটি দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছে।