+8801716-768210    info@azadhomoeohall.com

ডায়াবেটিস (Diabetes) রোগের ইতিহাস

ডায়াবেটিস (Diabetes Mellitus) মানবজাতির সবচেয়ে প্রাচীন রোগগুলোর মধ্যে একটি, যার ইতিহাস হাজার হাজার বছরের পুরনো। প্রাচীন সভ্যতার বিভিন্ন লিখিত দলিল ও চিকিৎসা সংক্রান্ত নথি থেকে এই রোগের অস্তিত্ব এবং এর লক্ষণ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।


১. প্রাচীন যুগে ডায়াবেটিস:

প্রাচীন মিশর (খ্রিস্টপূর্ব ১৫৫০): এবার্স প্যাপিরাস (Ebers Papyrus) নামক প্রাচীন মিশরীয় চিকিৎসা গ্রন্থে এমন একটি রোগের বর্ণনা পাওয়া যায় যেখানে "অতিরিক্ত প্রস্রাব" হওয়ার কথা উল্লেখ আছে। যদিও এটি সরাসরি ডায়াবেটিস কিনা তা নিশ্চিত নয়, তবে এটি ছিল এমন এক অবস্থা যা ডায়াবেটিসের একটি প্রধান লক্ষণ (ঘন ঘন প্রস্রাব)।

প্রাচীন ভারত (খ্রিস্টপূর্ব ৫০০-৬০০): ভারতীয় আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক সুশ্রুত এবং চরক (Charaka) প্রায় একই সময়ে "মধুম মেহ" (Madhumeha) বা "মধু মূত্র" নামক এক রোগের বর্ণনা দেন। তারা লক্ষ্য করেন যে, এই রোগের রোগীদের প্রস্রাব মিষ্টি হয় এবং পিঁপড়া সেই প্রস্রাবের প্রতি আকৃষ্ট হয়। তারা এই রোগের কিছু প্রকারভেদও চিহ্নিত করেছিলেন। এটি ডায়াবেটিসের প্রথম সুস্পষ্ট বর্ণনাগুলোর মধ্যে অন্যতম।

প্রাচীন গ্রীস (খ্রিস্টপূর্ব ২৩০): গ্রীক চিকিৎসক অ্যাপোলোনিয়াস অফ মেমফিস (Apollonius of Memphis) সম্ভবত প্রথম "ডায়াবেটিস" শব্দটি ব্যবহার করেন। গ্রীক শব্দ "ডায়াবাইনিন" (Diabainein) থেকে এই শব্দটি এসেছে, যার অর্থ "পেরিয়ে যাওয়া" বা "সাইফন"। এটি রোগীর শরীর থেকে অতিরিক্ত তরল বের হয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়াকে বোঝায়। পরবর্তীতে খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতকে ক্যাপাডোসিয়ার আরেটিয়াস (Aretaeus of Cappadocia) এই রোগের একটি বিস্তারিত এবং সঠিক বিবরণ দেন।

প্রাচীন রোম: রোমান চিকিৎসক গ্যালেন (Galen) তার কর্মজীবনে মাত্র দুজন ডায়াবেটিস রোগী দেখেছিলেন বলে মন্তব্য করেন, যা ইঙ্গিত দেয় যে রোমান সাম্রাজ্যের সময় এই রোগটি বিরল ছিল।

২. মধ্যযুগীয় এবং ইসলামী স্বর্ণযুগে ডায়াবেটিস

মধ্যযুগীয় ইউরোপ: মধ্যযুগে ইউরোপে ডায়াবেটিসের চিকিৎসা মূলত প্রাচীন গ্রীক ও রোমান পদ্ধতি অনুসরণ করত।
ইসলামী স্বর্ণযুগ: ইসলামী বিশ্বের চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। বিখ্যাত পার্সিয়ান চিকিৎসক আভিসেনা (Avicenna) (৯৮০-১০৩৭ খ্রিস্টাব্দ) তার "দ্য ক্যানন অফ মেডিসিন" (The Canon of Medicine) গ্রন্থে ডায়াবেটিস মেলিটাস সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা দেন। তিনি মিষ্টি প্রস্রাব, অস্বাভাবিক ক্ষুধা এবং যৌন কার্যকারিতার হ্রাস সহ ডায়াবেটিক গ্যাংগ্রিনের (Diabetic gangrene) বর্ণনাও করেন। তিনি প্রথম ডায়াবেটিস ইনসিপিডাস (Diabetes Insipidus) সম্পর্কেও সুনির্দিষ্ট বর্ণনা দেন, যা ডায়াবেটিস মেলিটাস থেকে ভিন্ন।

৩. আধুনিক যুগে ডায়াবেটিসের গবেষণা ও ইনসুলিনের আবিষ্কার:

১৭শ শতাব্দী: ১৬৭৫ সালে ইংরেজ চিকিৎসক থমাস উইলিস (Thomas Willis) "ডায়াবেটিস" শব্দের সাথে "মেলিটাস" (Mellitus) শব্দটি যোগ করেন। ল্যাটিন শব্দ "মেল" (mel) থেকে "মেলিটাস" এসেছে, যার অর্থ "মধু" বা "মিষ্টি"। তিনি রোগীর প্রস্রাব ও রক্তের মিষ্টি স্বাদ আবার আবিষ্কার করেন।

১৮শ শতাব্দী: ১৭৭৬ সালে ম্যাথিউ ডবসন (Matthew Dobson) নিশ্চিত করেন যে ডায়াবেটিস রোগীদের প্রস্রাবে অতিরিক্ত চিনির উপস্থিতি থাকে। তিনি প্রস্রাবে গ্লুকোজের পরিমাণ পরিমাপ করেন এবং এর উচ্চ মাত্রার কথা উল্লেখ করেন।

১৯শ শতাব্দী: ১৯শ শতকের শুরু পর্যন্ত ডায়াবেটিসের কোনো কার্যকর চিকিৎসা ছিল না এবং আক্রান্ত রোগীরা সাধারণত রোগ ধরা পড়ার কয়েক সপ্তাহ বা মাসের মধ্যেই মারা যেতেন।

১৮৮৯ সাল: জোসেফ ভন মেরিং (Joseph von Mering) এবং অস্কার মিনকোস্কি (Oskar Minkowski) জার্মান চিকিৎসাবিজ্ঞানী জুটি কুকুরের অগ্ন্যাশয় অপসারণ করে দেখান যে এটি কুকুরের ডায়াবেটিস হওয়ার কারণ। এটি ডায়াবেটিস রোগের প্যাথোজেনেসিসে অগ্ন্যাশয়ের ভূমিকার প্রথম প্রমাণ।

১৯১০ সাল: স্যার এডওয়ার্ড আলবার্ট শার্পি-শেফার (Sir Edward Albert Sharpey-Schafer) প্রস্তাব করেন যে, অগ্ন্যাশয় থেকে নিঃসৃত একটি নির্দিষ্ট রাসায়নিক পদার্থের অভাবে ডায়াবেটিস হয়। তিনি এর নাম দেন "ইনসুলিন" (Insulin), যা অগ্ন্যাশয়ের ল্যাঙ্গারহ্যান্স দ্বীপপুঞ্জ (Islets of Langerhans) থেকে উৎপন্ন হয়।

৪. ২০শ শতাব্দীর যুগান্তকারী আবিষ্কার - ইনসুলিন (১৯২১-১৯২২):

১৯২১ সালে কানাডার বিজ্ঞানী ফ্রেডরিক বেন্টিং (Frederick Banting) এবং চার্লস বেস্ট (Charles Best) টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক জন ম্যাক্লিওড (John Macleod) এবং জেমস কলিপের (James Collip) সহায়তায় কুকুরের অগ্ন্যাশয় থেকে ইনসুলিন নিষ্কাশন করেন।
১৯২২ সালের ২১শে জানুয়ারি, ১৪ বছর বয়সী লিওনার্ড থম্পসন (Leonard Thompson) নামের একজন টাইপ ১ ডায়াবেটিস রোগীকে প্রথম ইনসুলিন দেওয়া হয়। প্রথমবার এটি পুরোপুরি সফল না হলেও, দ্বিতীয়বার বিশুদ্ধ ইনসুলিন প্রয়োগের পর এটি কার্যকর হয়। এটি ছিল মানবজাতির ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা। ইনসুলিনের আবিষ্কারের ফলে টাইপ ১ ডায়াবেটিস রোগীদের জীবন বাঁচানো সম্ভব হয়, যা আগে নিশ্চিত মৃত্যুর কারণ ছিল। এই আবিষ্কারের জন্য বেন্টিং এবং ম্যাক্লিওড ১৯২৩ সালে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন এবং তারা বেস্ট ও কলিপের সাথে তাদের এই সম্মান ভাগ করে নেন।

৫. বর্তমান যুগ:

ইনসুলিনের আবিষ্কারের পর থেকে ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় অনেক উন্নতি হয়েছে। কৃত্রিম ইনসুলিনের উৎপাদন, ইনসুলিন পাম্প, গ্লুকোজ মনিটরিং ডিভাইস এবং ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনার কৌশলগুলোতে ব্যাপক অগ্রগতি হয়েছে। বর্তমানে ডায়াবেটিস একটি বিশ্বব্যাপী মহামারী আকার ধারণ করেছে, বিশেষ করে টাইপ ২ ডায়াবেটিস, যা অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং স্থূলতার সাথে সম্পর্কিত। আধুনিক গবেষণা ডায়াবেটিস প্রতিরোধের উপায়, নতুন ওষুধ এবং আরও কার্যকর চিকিৎসার পদ্ধতি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে।