আর্থ্রাইটিস একটি প্রাচীন রোগ, যা মানব ইতিহাসের শুরু থেকেই বিদ্যমান। এর ইতিহাস মানবজাতির বিবর্তন, স্বাস্থ্য এবং চিকিৎসার ধারণার সাথে গভীরভাবে জড়িত।
(ক) প্রাগৈতিহাসিক যুগ: জীবাশ্মের রেকর্ড এবং প্রাচীন কঙ্কাল পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে, ডাইনোসর এবং প্রাগৈতিহাসিক মানুষের মধ্যেও আর্থ্রাইটিসের লক্ষণ ছিল। মানুষের মধ্যে ৪,৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দেও আর্থ্রাইটিসের প্রমাণ পাওয়া গেছে। ওটজি, প্রায় ৩০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের একটি মমি, যার দেহ আধুনিক ইতালি এবং অস্ট্রিয়ার সীমান্তে পাওয়া গিয়েছিল, তার কঙ্কালে আর্থ্রাইটিসের লক্ষণ দেখা গেছে। ২৫৯০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মিশরীয় মমিদের কঙ্কালেও আর্থ্রাইটিসের প্রমাণ মিলেছে।
লক্ষণ:
(ক) প্রাচীন ভারত: ১২৩ খ্রিস্টাব্দে রচিত প্রাচীন ভারতীয় গ্রন্থ 'চরক সংহিতা'-তে এমন একটি রোগের বর্ণনা আছে যেখানে ফুলে যাওয়া, বেদনাদায়ক জয়েন্ট প্রথমে হাত ও পা আক্রান্ত করে, তারপর সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে, যার ফলে ক্ষুধামন্দা এবং মাঝে মাঝে জ্বর হয়। এই বিবরণ রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের লক্ষণের সাথে বেশ সাদৃশ্যপূর্ণ।
(খ) প্রাচীন চীন: প্রাচীন চীনা চিকিৎসায় আর্থ্রাইটিস-সম্পর্কিত রোগগুলিকে "বাই সিনড্রোম" হিসাবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়েছিল, যা বায়ু এবং ঠান্ডার মতো পরিবেশগত কারণগুলির ফলে ঘটে বলে মনে করা হত। ঐতিহ্যবাহী চীনা ঔষধ (TCM) এই সমস্যাগুলির চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন ভেষজ ব্যবহার করত।
(ঘ) জয়েন্টের নমনীয়তা কমে যাওয়া।
(গ) প্রাচীন গ্রীস ও রোম: হিপোক্রেটিস, গ্যালেন প্রমুখ প্রাচীন গ্রিক ও রোমান চিকিৎসকরা জয়েন্টের ব্যথা এবং প্রদাহ সম্পর্কে জানতেন, যদিও তারা এটিকে একটি একক রোগ হিসেবে দেখেননি। তারা এটি বিভিন্ন "হিউমার" (শরীরের তরল) এর ভারসাম্যহীনতার ফল বলে মনে করতেন।
(ক) মধ্যযুগ: এই সময়ে, জয়েন্টের যেকোনো ধরনের অসুস্থতাকে "গাট্টা" (gutta) নামে অভিহিত করা হত, যা ল্যাটিন শব্দ "ড্রপ" থেকে এসেছে। বিশ্বাস করা হত যে, শরীরের ক্ষতিকারক তরল (নক্সিয়াস হিউমার) জয়েন্টগুলিতে "ফোঁটায় ফোঁটায়" জমা হয়ে রোগ সৃষ্টি করে। গেঁটে বাত (Gout) শব্দটি এই ধারণা থেকেই এসেছে।
(২) রেনেসাঁস: চিকিৎসা জ্ঞানের প্রসারের সাথে সাথে অস্ত্রোপচারের কিছু প্রাথমিক রূপ আর্থ্রাইটিসের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হতে শুরু করে, যদিও তা খুবই সীমিত আকারে। ১৫৫৯ সালে ফরাসি চিকিৎসক গুইলোম ডি বেইলু প্রথম আর্থ্রাইটিস নিয়ে একটি বই লেখেন, যেখানে তিনি "রিউম্যাটিজম" শব্দটি ব্যবহার করেন জয়েন্টের প্রদাহ, ব্যথা এবং পেশীগুলির দৃঢ়তা বর্ণনা করার জন্য।
(১) ১৭শ-১৮শ শতাব্দী: উইলিয়াম মাসগ্রেভ ১৭১৫ সালে তার গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা গ্রন্থ "De Arthritide Symptomatica" প্রকাশ করেন, যা রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের লক্ষণগুলির বিস্তারিত বর্ণনা প্রদান করে।
(ক) ১৮০০ সালে ফরাসি চিকিৎসক ড. অগাস্টিন জ্যাকব ল্যান্ড্রে-বিউভেইস (Augustin Jacob Landré-Beauvais) রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের প্রথম স্বীকৃত বর্ণনা দেন। যদিও তিনি এটিকে গেঁটে বাতের একটি প্রকার হিসাবে ভুলভাবে শ্রেণীবদ্ধ করেছিলেন, তার কাজ অন্যদের এই রোগ নিয়ে আরও গবেষণার জন্য উৎসাহিত করে।
(খ) ১৮৫৯ সালে ব্রিটিশ রিউমাটোলজিস্ট ড. আলফ্রেড বারিং গ্যারোড (Dr. Alfred Baring Garrod) "রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস" (Rheumatoid Arthritis) শব্দটি প্রবর্তন করেন এবং এটিকে গেঁটে বাত থেকে আলাদা একটি রোগ হিসেবে স্বীকৃতি দেন।
(গ) ১৮৯৭ সালে জার্মান বিজ্ঞানী ফেলিক্স হফম্যান উইলোগাছ থেকে অ্যাসপিরিন তৈরি করেন, যা ব্যথা এবং প্রদাহ কমানোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আধুনিক ঔষধ হিসেবে আবির্ভূত হয় এবং আর্থ্রাইটিসের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হতে শুরু করে।
(ক) জয়েন্টে তীব্র ব্যথা, ফোলা এবং গরম অনুভূত হওয়া।
(খ) সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর দীর্ঘ সময় (৩০ মিনিটের বেশি) জয়েন্ট শক্ত হয়ে থাকা।
(গ) ক্লান্তি, জ্বর এবং ওজন কমে যাওয়া।
(ঘ) প্রায়শই শরীরের অন্যান্য অংশেও প্রভাব ফেলতে পারে, যেমন চোখ, ফুসফুস এবং রক্তনালী।
(খ) ১৯৩৯ সালে আর্থ্রাইটিসের প্রথম অটোইমিউন তত্ত্ব সামনে আসে, যা রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের কারণ সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে বিপ্লব ঘটায়।
(গ) ১৯৬০-এর দশকে জন চার্নলি ইংল্যান্ডে আর্থ্রাইটিসের চিকিৎসার জন্য প্রথম সফল হিপ প্রতিস্থাপন (total hip arthroplasty) করেন, যা আর্থ্রাইটিস আক্রান্ত রোগীদের জন্য একটি যুগান্তকারী চিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবে প্রমাণিত হয়।
আর্থ্রাইটিস সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান অনেক গভীর। আমরা জানি যে এটি শুধুমাত্র একটি রোগ নয়, বরং ১০০টিরও বেশি বিভিন্ন প্রকারের অবস্থার সমষ্টি। আধুনিক গবেষণার ফলে বিভিন্ন ধরণের আর্থ্রাইটিসের (যেমন অস্টিওআর্থ্রাইটিস, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, গাউট, সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিস ইত্যাদি) কারণ, লক্ষণ এবং চিকিৎসার পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানা গেছে। ঔষধ (যেমন NSAIDs, DMARDs, বায়োলজিকস), শারীরিক থেরাপি, জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং ক্ষেত্রবিশেষে অস্ত্রোপচার সহ বহুবিধ চিকিৎসার বিকল্প এখন উপলব্ধ। এই রোগের ইতিহাস প্রমাণ করে যে, মানবজাতি যুগ যুগ ধরে এই চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করে আসছে এবং চিকিৎসা বিজ্ঞান ক্রমাগত এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নতুন নতুন অগ্রগতি অর্জন করছে।